◊
নিউইয়র্ক থেকে প্রমোদ রন্জন সরকার:
ভাটি বাংলার কৃতি সন্তান কমরেড বরুণ রায় ও ডক্টর নীহার রন্জন রায়কে নিয়ে লিখেছি।সেই ধারাবাহিকতায় আজ লিখছি ভাটি বাংলার আর এক কীর্তিমান পূরুষ ব্যারিষ্টার ভূপেশ গুপ্তকে নিয়ে অতি সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ।
ব্যারিস্টার ভূপেশ গুপ্ত ভারত বর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা,বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন।বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার ইটনা থানা সদরে ২০ শে অক্টোবর ১৯১৪ সালে এক সামন্ত ও জমিদার পরিবারে ভূপেশ গুপ্ত জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মহেশ চন্দ্র গুপ্ত।
শিক্ষা ও রাজনৈতিক জীবনঃ- তিনি কলিকাতা স্কটিশ চার্চ ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন।ছাত্র অবস্থাতেই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড জড়িয়ে পড়েন। বিপ্লবী আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।বিপ্লবী কার্যকলাপের জন্য ১৯৩০ সালে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন।১৯৩৭ সাল পর্যন্ত বন্দী জীবন কাটান।কারাগারে অন্তরীণ অবস্থাতেই আইএ বিএ পাশ করেন।মুক্তি পেয়ে লন্ডন যান। সেখানে এলএল বি ডিগ্রি ও মিডল ট্যাম্পল থেকে ব্যারিস্টার পাশ করেন।১৯৪১ সালে ভারতে ফিরে এসে কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।১৯৪৮ সালে পশ্চিম বঙ্গে পার্টি নিষিদ্ধ হলে আত্মগোপনে কাজ করতে থাকেন।
১৯৫১ সালে গ্রেপ্তার হয়ে দমদম জেলে বন্দী থাকা অবস্থায় রাজ্য সভার সদস্য নির্বাচিত হন।তিনি বরাবরেই এই আসনের সদস্য ছিলেন।১৯৫২ থেকে টানা ২২ বছর রাজ্য সভার সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।ভূপেশ গুপ্ত কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় সদস্য ও কেন্দ্রীয় সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।১৯৫৭ ১৯৬০ ১৯৬৯ সালে মস্কোতে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক সন্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন।তিনি কলিকাতা হাইকোর্টের ও আইনজীবী ছিলেন। তিনি শুধু আইনজীবীই ছিলেন না ছিলেন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান,সুলেখক,সাংবাদিক,সমাজ কর্মী এবং একজন স্হপতি।১৯৬৬ সাল থেকে ভারতের নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক এবং দৈনিক স্বাধীনতার সম্পাদকীয় বোর্ডের সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।ভূপেশ গুপ্ত বাংলা ও ইংরেজীতে কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ” ফ্রিডম এন্ড দি সেকেন্ড ফ্রন্ট” টেরার অব বেঙ্গল ” ফাইভ ইয়ারস প্লান ” এ ক্রিটিক বি-গ-লুট অন্যতম।
১৯৪৫ সালের ৮এপ্রিল নেত্রকোনা নেত্রকোনায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত( সর্বভারতীয়) কৃষক সন্মেলনে যোগান করেন।যে সন্মেলনের মূল সংগঠক ছিলেন কমরেড মনি সিংহ।ভারতের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা পিসি যোশী,কল্পনা যোশী ( দত্ত), মনিকুন্তলা সেন, কমরেড মোজাফফর আহমদ,আইএমএফ নাম্বুদিরাপাদ,পি,সুন্দরাইয়া, বঙ্কিম মুখার্জি,ভবানী সেন,আব্দুল্লা রসুল,মনি কুন্তল সেন সহ ভারতের আরো শীর্ষ স্থানীয় কমিউনিস্ট ও কৃষক নেতারা তিন দিন ব্যাপী এই সন্মেলনে যোগদান করেন।৭০ একর জমির উপর প্যান্ডেল নির্মাণ করা হয়েছিল।লক্ষাধিক লোক সমাগম হয়েছিল।পিসি যোশী এই সন্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন।
এক তথ্য জানা যায় যে তিনি রাজনীতি ও ব্যক্তিত্বে এতোটাই প্রখর ছিলেন যে পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর কন্যা ইন্দিরা দেবী কে তাঁর কাছে বিবাহ দিতে প্রস্তাব দিয়েছিলেন।তিনি বলেছিলেন আমি কমিউনিস্ট বিপ্লবী,কোন দিনেই বিবাহ করব না।তিনি অবিবাহিত ছিলেন।
ভূপেশ গুপ্তের পিতা ইটনার জমিদারদের ( ইটনার দেওয়ানদের) নায়েব ছিলেন।প্রভুত্ব অর্থ সম্পদ অর্জন করেছিলেন।কিন্ত দেওয়ানদের সেরেস্তায় নায়েবের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকায় মনিবের সন্মতি ব্যতীত কিছু করা সম্ভব ছিল না।১৯০৪ সালে দেওয়ানদের অনুমতিক্রমে ইটনায় একটি ডিসপেনসারী প্রতিষ্টা করেন।যেখানে তাঁর মাসিক অনুদান ছিল ৩৬/= টাকা আর দেওয়ানদের ছিল মাসিক ৪/= টাকা।মহেশ চন্দ্র গুপ্ত নিজে হাতি কিনবেন বলে দেওয়ানদের কে আগে হাতি কিনে দেন।তারপর নিজে কিনেন।জানা যায় অনেক পূর্বেই ভূপেশ গুপ্তের পিতা মহেশ চন্দ গুপ্ত ইটনায় একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার মনোবাসনা প্রকাশ করেছিলেন।কিন্তু তখন দেওয়ানদের অনিচ্ছার কারণে তাঁর জীবদ্দশায় করে যেতে পারেননি। মহেশ চন্দ্র গুপ্তের সুযোগ্য পুত্র ইটনার কৃতি সন্তান ব্যারিস্টার ভূপেশ গুপ্ত পিতার লালিত বাসনাকে বাস্তবায়িত করলেন।১৯৪৩ সালে নিজ আবাস ভূমে তাঁর স্বর্গীয় পিতা মহেশ চন্দ্র গুপ্তের নামানুসারে প্রতিষ্ঠা করেন ইটনা মহেশ চন্দ্র শিক্ষা নিকেতন।সূচিত হলো ইটনা মহেশ চন্দ্র শিক্ষা নিকেতনের সুবর্ণ ইতিহাস।এটিই হাওর অধ্যুষিত ইটনা থানার প্রথম হাইস্কুল।যার প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন সিলুন্দ্যা গ্রামের ধীরু চৌধুরী। এই স্কুলটির মাধ্যমে গোটা ইটনা মিঠামইন সহ সন্নিহিত ভাটি অঞ্চলের মানুষের শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হয়।বর্তমান প্রজন্ম সহ এর আগের প্রজন্মের খুব বেশী মানুষ ভূপেশ গুপ্তকে জানে না। এসব মনিষী সম্পর্কে যতই জানবো ততই আমাদের লাভ।তাই আমাদের ভাটি বাংলার কৃতি পূরুষদের স্মরণ করা ও তাঁদের জীবনী অনুসরণ করা প্রয়োজন।
ব্যারিস্টার ভূপেশ গুপ্ত চিকিৎসার জন্য মস্কোতে গিয়েছিলেন।৬ ই আগস্ট ১৯৮১ সালে মস্কোতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।এই কৃতি পুরুষকে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।
#তথ্যসূত্র : নিউইয়র্ক প্রবাসী লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রমোদ রন্জন সরকার এর একটি স্মৃতিচারণ মূলক লিখা থেকে সংগৃহিত।
বিঃদ্রঃ আমার ( প্রমোদ রন্জন সরকার) স্বর্গীয় পিতা ইটনা মহেশ চন্দ্র শিক্ষা নিকেতনের প্রথম ব্যাচের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন এবং ১৯৪৬ সনে মেট্রিকুলেশন পাস করেন।