শিরোনাম :
বাউফলে গণকবরস্থানে চাঁদা চেয়ে হামলা, প্রশাসনের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবীর অভিযোগ। সাবেক ডিজিএফআই এর মহাপরিচালক জেনারেল আকবর এবং এস এসএফ প্রধান লে. জেনারেল মুজিবুর রহমান এখন ভারতে মোদির আশ্রয়ে। জিয়া পরিবারের চার দশকের ঠিকানা হারানোর পেছনে তৎকালীন সেনাপ্রধান মুবীন। আজ ১২ জানুয়ারি বিপ্লবী যোদ্ধা মাস্টার দা সূর্য সেন এর প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলী। ইমাম খোমেনি ও আমেরিকার গুঁটিচাল। সম্রাট বাবরের পরাজয় এবং শানে শাহ ওবায়দুল্লাহ আহরার (রহঃ)। এক যে ছিল নেতা–দেবারতী মুখোপাধ্যায়। রাজনীতির রহস্য মানব সিরাজুল আলম খান। ভোলায় ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে বন্ধুর হাতে বন্ধু খুন। গ্যাস সংকটে জ্বলছে না চুলা।  সিলিন্ডার ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি ভোক্তাগণ।  এটি ভোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা —-ক্যাব সভাপতি। 
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:৩৩ পূর্বাহ্ন

সুলতানি যুগে বাংলায় ইসলামের প্রসার।

Reporter Name / ৬৩ Time View
Update : শনিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫

(প্রথম পর্ব)
–রানা চক্রবর্তী
বখতিয়ার খলজির স্বল্পকালস্থায়ী রাজত্বকালেই বাংলায় যে সর্বপ্রথম মুসলমান সমাজের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, এবিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁর অবশ্য আমির ও সৈন্যরাই তখন নববিজিত এই রাজ্যে নিজেদের বসতি স্থাপন করেছিলেন। তবে পরবর্তীসময়ে অবশ্য নানা কারণে উত্তর ভারত থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শ্রেণীর মুসলমানরা বাংলায় প্রবেশ করেছিলেন। এছাড়া হয়ত বাণিজ্য উপলক্ষ্যে পশ্চিম এশিয়া থেকে তখন যেসব মুসলমানরা চট্টগ্রাম বন্দরে উপস্থিত হতেন, তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ এদেশের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এসব সত্ত্বেও এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, অবিভক্ত বাংলার মুসলমানদের অধিকাংশই আদতে মধ্যযুগে ধর্মান্তরিত হওয়া হিন্দুদেরই বংশধর।
ঐতিহাসিকদের মতে, সুলতানিযুগের বাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রসারের পিছনে মূলতঃ দুটি প্রধান কারণ ছিল।
প্রথমতঃ, সেযুগের মুসলমান শাসকদের জন্য বিজিত দেশে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করবার জন্য তখন ইসলাম ধর্মাবলম্বী একটি নতুন সমাজের পত্তন করা অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছিল। কারণ, বিধর্মীরা তখন এখানে প্রবলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন, এবং এই নতুন শাসকদের প্রতি তাঁদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিরোধিতার যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল। তাই যদিও এই বিরোধিতাকে দমন করবার জন্য সেযুগে সামরিক শক্তিই শাসকদের প্রধান অস্ত্র ছিল, কিন্তু তবুও তৎকালীন বাংলার জনসমাজের মধ্যে ইসলাম ধর্মাবলম্বী একটি গোষ্ঠীর সহযোগিতার মূল্যও কম কিছু ছিল না। একারণেই সুলতান মহাম্মদ বিন তুঘলক যখন দেবগিরিতে নিজের নতুন রাজধানী স্থাপন করেছিলেন, তখন তিনি দিল্লি থেকে বহু আমির ও রাজকর্মচারী এবং সেখানকার মুসলমান জনতার একাংশকেও সেই নতুন রাজধানীতে যেতে বাধ্য করেছিলেন। প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, তখন দক্ষিণ ভারতে মুসলমান অধিবাসীর সংখ্যা খুবই কম ছিল বলে, সেখানকার বিপুল-সংখ্যক হিন্দুদের পাশাপাশি থাকতে হলে মুসলমানের সংখ্যাবৃদ্ধি করাও অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে সুলতানিযুগের বাংলার শাসকেরাও এই একই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তবে উত্তর ভারত থেকে বাংলায় মুসলমানদের আমদানি করে এখানে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব ছিল না বলেই স্থানীয় হিন্দুদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করে বাংলায় তখন মুসলমান সমাজের সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
দ্বিতীয়তঃ, ইসলামধর্ম প্রত্যেক মুসলমানকে এই শিক্ষাই দেয় যে, বিধর্মীদের সত্যধর্মে দীক্ষা দেওয়া তাঁদের একটি আবশ্যিক কর্তব্য। বস্তুতঃ ইসলামের শাস্ত্রভিত্তিক আইন একথাই বলে যে, হয় মুসলমান রাজ্যের অমুসলমান অধিবাসীদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হবে, আর নয়ত জিজিয়া কর দিয়ে মুসলমানদের কাছ থেকে তাঁদের নিজেদের প্রাণ ও সম্পত্তি রক্ষা করবার অধিকার ক্রয় করতে হবে। কিন্তু যদিও মধ্যযুগের ভারতের—বিশেষতঃ সুলতানিযুগের ভারতের অধিকাংশ শাসকই এই নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়, অন্যদিকে তবুও মধ্যযুগের বাংলায় হিন্দুদের উপরে কখনো জিজিয়া কর ধার্য করা হয়েছিল বলে ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে বাংলায় এবং সমকালীন ভারতের অন্যান্য প্রদেশে তখন নানাভাবে ইসলাম ধর্ম প্রচার করা হয়েছিল, এবং সেযুগের বহু হিন্দু যে স্বেচ্ছায় অথবা বাধ্য হয়ে নিজের ধর্ম ত্যাগ করেছিলেন, ইতিহাস এবিষয়ে অবশ্যই সাক্ষ্য দেয়। এছাড়া মুসলমান দরবেশরাও তখন এদেশে নিজেদের ধর্মপ্রচারে উৎসাহ-সহকারে অংশ নিয়েছিলেন, এবং তৎকালীন মুসলমান রাষ্ট্রের শাসননীতি একাজে তাঁদের সাহায্য করেছিল।
তবে যদিও এই দুটি সাধারণ কারণই তখন সমগ্র ভারতেই ইসলাম ধর্ম প্রচারের বিষয়ে সহায়ক হয়েছিল, কিন্তু তবুও শুধুমাত্র দুটি প্রদেশ—পাঞ্জাব ও বাংলা বাদে তদানীন্তন ভারতের অন্য কোন প্রদেশে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারেননি বলেই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। আবার এই দুটি প্রদেশের মধ্যেও মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আঞ্চলিক ছিল—পাঞ্জাবের পশ্চিমাংশে, আর বাংলার পূর্বাংশে। তাই ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে এই দুটি প্রদেশের এই পার্থক্যের কারণ সম্বন্ধে বিস্তারিত ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার প্রয়োজন থাকলেও অতীতে এদিকে দৃষ্টি না দিয়েই কোন কোন ঐতিহাসিক পূর্ব বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সম্বন্ধে অতি সরল ও কল্পনা-ভিত্তিক ব্যাখ্যা উপস্থিত করেছিলেন বলে লক্ষ্য করা যায়। যেমন—অধ্যাপক ও ঐতিহাসিক আবদুল করিম এবিষয়ে তাঁর ‘বাংলার ইতিহাস’ নামক গ্রন্থের ৫২৬নং পৃষ্ঠায় বলেছিলেন—
“নির্যাতিত বৌদ্ধ ও শূদ্ররা মুসলমান সূফী-সাধকদের চরিত্রে এবং মুসলমানদের বর্ণ বৈষম্যহীন সমাজ-ব্যবস্থায় মুগ্ধ হইয়া ইসলাম ধর্মের দিকে আকৃষ্ট হয়।”
কিন্তু অন্যান্যদের মতে, তাঁর এই মত আসলে একটি প্রচলিত ধারণার পুনরুক্তিমাত্র বা একটি ‘a priori’ সিদ্ধান্ত ছিল; তাছাড়া নিজের এই বক্তব্যের সমর্থনে তিনি কোন ধরণের যুক্তিও উত্থাপন করেননি বলেও লক্ষ্য করা যায়। শুধু তাই নয়, ইসলাম ধর্মের প্রতি নির্যাতিত বৌদ্ধ ও শূদ্রদের আকর্ষণ তখন শুধুমাত্র পূর্ব বাংলায় এবং উত্তর বাংলার বৃহত্তর অংশেই সীমাবদ্ধ ছিল কেন—এবিষয়েও অধ্যাপক করিমের পূর্বোক্ত গ্রন্থে কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। অন্যদিকে ইতিহাসও বলে যে, যদিও এসব নির্যাতিত বৌদ্ধ ও শূদ্ররা তখন বাংলার রাঢ় অঞ্চলেও ছিলেন, এবং এসব অঞ্চলে মুসলমান সুফী-সাধকদের আস্তানার কোন অভাবও ছিল না, কিন্তু তবুও পশ্চিম বাংলায় হিন্দুদের সংখ্যাধিক্য দীর্ঘকালব্যাপী মুসলমান শাসনকালে কখনো ক্ষুন্ন হয়নি। তবে আরেক ঐতিহাসিক—রমেশচন্দ্র মজুমদার এই একই বিষয় নিয়ে তাঁর গ্রন্থে অপেক্ষাকৃত বিশদে আলোচনা করেছিলেন বলে দেখতে পাওয়া যায়। এপ্রসঙ্গে তিনি তাঁর ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ নামক গ্রন্থের মধ্যযুগ খণ্ডের ২১২-১৩নং পৃষ্ঠায় জানিয়েছিলেন—
“হিন্দু সমাজে নিম্নশ্রেণীর লোকেরা নানা অসুবিধা ও অপমান সহ্য করিত। কিন্তু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিলে যোগ্যতা অনুসারে রাজ্যে ও সমাজে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করার পক্ষেও তাঁহাদের কোন বাধা ছিল না।”
কিন্তু এরপরে নিজের এই বস্তুব্যের সমর্থনে তিনি ইতিহাস থেকে একটিমাত্র উদাহরণ তুলে ধরেছিলেন—
“বখতিয়ার খিলজীর একজন মেচ জাতীয় অনুচর গৌড়ের সম্রাট হইয়াছিলেন।”
এখানে লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, নিজের এই বক্তব্যে তিনি সেই ব্যক্তির নামোল্লেখ করেননি। এছাড়া সুলতানিযুগের বাংলার একমাত্র হিন্দু শাসক—রাজা গণেশের ধর্মান্তরিত হওয়া পুত্র জলালউদ্দীনের নামও তাঁর লেখায় পাওয়া যায় না। তবে সরকারি চাকরির লোভও তখন যে বহু হিন্দুর ধর্মত্যাগের পিছনে একটি প্রধান কারণ ছিল, এবিষয়ে অন্যদের কোন সন্দেহ নেই। কারণ—
“ষোড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভে পর্তুগীজ পর্যটক দুয়ার্তে বারবোসা বাংলা দেশ সম্বন্ধে লিখিয়াছেন যে রাজ-অনুগ্রহ পাইবার জন্য প্রতি দিন হিন্দুরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।”
“The Heathen of these parts daily become Moors to gain the favour of their rulers.” (The Book of Duarte Barbosa, Translated by M.L. Dames, Vol. II, p- 147)
অন্যদিকে এপ্রসঙ্গে অধ্যাপক করিম জানিয়েছিলেন যে, তখন নাকি—
“সংস্কৃতের পরিবর্তে (রাজভাষা) ফার্সী ভাষা শিখিলেই রাজ-সরকারে চাকুরী পাওয়া যায়।”
কিন্তু তাঁর একথা সত্যি হলে এটাই বলতে হয় যে, সেযুগে সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য কোন হিন্দুর স্বধর্ম ত্যাগ করবার প্রয়োজন হত না; কারণ, ফারসি ভাষা পড়বার জন্য তখন কারো ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা অপরিহার্য ছিল না। আসলে সেযুগের হিন্দুদের রাজকার্য থেকে বঞ্চিত করে রাখবার জন্য মুসলমান শাসকেরা তখন একটি বিশেষ নীতি অনুসরণ করেছিলেন, আর এই নীতিই সুলতানিযুগের বাংলায় ইসলাম ধর্ম প্রচারের একটি প্রধান অস্ত্ররূপে ব্যবহৃত হয়েছিল। বস্তুতঃ ইতিহাস কিন্তু স্পষ্টভাবেই বলে যে, এদেশে মুসলমান রাজত্ব স্থাপিত হওয়ার প্রায় দু’শো বছর পরে সুলতান হোসেন শাহের আমলেই সর্বপ্রথম কয়েকজন হিন্দু তৎকালীন সুলতানি প্রশাসনের উচ্চপদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তবে যদিও এপ্রসঙ্গে অধ্যাপক করিম তাঁর ‘বাংলার ইতিহাস’ নামক গ্রন্থের ৪০৫নং পৃষ্ঠায় বলেছিলেন—
“ইলিয়াস শাহী আমল হইতে বাংলা দেশের হিন্দুরা উচ্চ পদে নিযুক্ত হইত, পরবর্তী ইলিয়াস শাহী সুলতানেরাও পূর্ববর্তী সুলতানদের নীতি অনুসরণ করিতেন এবং হোসেন শাহ এই নিয়ম অনুসরণ করিয়া হিন্দুদিগকে উচ্চ পদে নিযুক্ত করেন।”
কিন্তু তবুও নিজের এই উক্তির স্বপক্ষে এই গ্রন্থে তিনি কোন ধরণের প্রমাণ উপস্থিত করেননি বলেই দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, যদিও তাঁর এই গ্রন্থের অধিকাংশ পৃষ্ঠাতেই পাদটীকার মাধ্যমে সূত্রের উল্লেখ করা হয়েছিল, এমনকি যে পৃষ্ঠায় তিনি পূর্বোল্লিখিত উক্তিটি করেছিলেন—সেই পৃষ্ঠাতেও দুটি পাদটীকা রয়েছে, কিন্তু তবুও এই বিশেষ উক্তিটি সম্বন্ধে এই গ্রন্থে কোন পাদটীকা দেখতে পাওয়া যায় না। অন্যদিকে অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায় এবিষয়ে তাঁর ‘বাংলার ইতিহাসের দু’শো বছর’ নামক গ্রন্থের ৪০১-০২নং পৃষ্ঠায় বলেছিলেন—
“সব সময়ে সমস্ত কাজের জন্য যোগ্য মুসলমান কর্মচারী পাওয়া যেত না বলে হিন্দুদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের প্রথা অনেকদিন আগে থেকেই চলে আসছিল—রুকনুদ্দীন বারবক শাহের আমলেও বহু হিন্দু উচ্চ রাজপদে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। হোসেন শাহ এ ব্যাপারে পূর্ববর্তী সুলতানদের প্রথা অনুসরণ করেছিলেন।”
কিন্তু এক্ষেত্রে প্রথমেই যেটা স্মরণীয়, সেটা হল যে, সুলতান রুকনউদ্দীন বারবক শাহ বখতিয়ার খলজির প্রায় আড়াইশো বছর পরে বাংলার মসনদে আসীন হয়েছিলেন, আর এই দীর্ঘকাল সময়ের মধ্যে হিন্দুদের উচ্চ রাজপদে প্রতিষ্ঠার কোন প্রমাণ এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বাস্তবে এসময়ে শাসনকার্যের তাগিদে, অথবা রাজনৈতিক প্রয়োজন সিদ্ধি করবার জন্য, অথবা শাসকের ব্যক্তিগত উদারতা বা অনুগ্রহ প্রদর্শন করবার উদ্দেশ্যে শাসিত সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবিশেষকে অথবা কোন ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে উচ্চ রাজপদে নিয়োগ করা হলেও কিছু কিছু ইতঃস্ততঃ বিক্ষিপ্ত দৃষ্টান্তের উপরে ভিত্তি করে এবিষয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রের সাধারণ নীতি সম্বন্ধে কোন সিদ্ধান্ত করাটা কিন্তু ইতিহাসের দিক থেকে অসঙ্গত বলেই মনে হয়। আর এপ্রসঙ্গে একথাও স্মরণীয় যে, এরপরে ইংরেজ আমলেও বহু ভারতীয় উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু তার ফলে এদেশে শাসক জাতির একাধিপত্য কিন্তু কোনভাবেই ক্ষুন্ন হয়নি। এছাড়া সুলতানি আমলের বাংলায় সরকারি চাকরির বিষয়ে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের বাস্তব অবস্থা যে কি ছিল, এর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বারবোসার নিরপেক্ষ উক্তিতেই পাওয়া যায়।
তাছাড়া একটু আগেই বলা হয়েছে যে, মুসলমানদের বর্ণ-বৈষম্যহীন সমাজ-ব্যবস্থায় তখনকার পশ্চিম বাংলার তথাকথিত নির্যাতিত বৌদ্ধ ও শূদ্ররা কেন মুগ্ধ হননি, এর কোন কারণ অধ্যাপক করিমের পূর্বোক্ত গ্রন্থে পাওয়া যায় না। শুধু তাই নয়, সেযুগের মুসলমানদের সমাজ-ব্যবস্থা বর্ণ-বৈষম্যহীন ছিল, —তাঁর একথাটিও কিন্তু ইতিহাসগতভাবে সঠিক নয়। কারণ—‘সৈয়দ’ (যাঁরা হজরত মহাম্মদের কন্যা ফতিমার বংশধর বলে নিজেদের দাবি করেন), ‘আলিম’ (পণ্ডিত ও শিক্ষাব্রতী), ‘শেখ’, ‘পীর’ প্রভৃতি শ্রেণীভুক্ত ব্যক্তিরা সেযুগের মুসলমান জনসাধারণের কাছে বিশেষ শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্ররূপে এদেশের মুসলিম সমাজের উচ্চস্তরের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বিশেষতঃ আব্বাস বংশীয় খলিফাদের সময় থেকে সৈয়দেরা মুসলমান সমাজে বিশেষ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। আর পরবর্তীসময়ে মুসলমানদের মধ্যে শিয়া সম্প্রদায়ের বিস্তৃতির ফলে তাঁদের এই মর্যাদা আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল; কারণ, শিয়ারা ফতিমার স্বামী আলী এবং তাঁদের বংশধরদেরই খিলাফতের প্রকৃত অধিকারী বলে মনে করতেন। একারণেই খৃষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর শেষের দিকে তৈমুর লঙ যখন দিল্লি আক্রমণ করেছিলেন, তখন তিনি সৈয়দ এবং ধর্মীয় শ্রেণীভুক্ত মুসলমানদের রক্ষা করবার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে পরবর্তীসময়ে দিল্লির সুলতান সিকন্দর লোদী সরকারি রাজস্ব অপহরণকারী একজন সৈয়দকে তাঁর প্রাপ্য শাস্তি থেকে অব্যাহতি তো দিয়েছিলেনই, এমনকি তাঁকে সেই অপহৃত অর্থ ফেরৎ দিতেও বাধ্য করেননি। এসব ঐতিহাসিক তথ্য থেকে পরিষ্কারভাবেই বুঝতে পারা যায় যে, সেযুগের হিন্দুসমাজে ব্রাহ্মণরা যেরকম সুবিধা ভোগ করতেন, সমকালীন মুসলমান সমাজে সৈয়দরা ঠিক একইরকমের সুবিধার অধিকারী ছিলেন। আর ব্রাহ্মণদের মতোই এই সুবিধা তখন তাঁরা জন্মসূত্রে লাভ করতেন, নিজেদের কোন ব্যক্তিগত কৃতিত্বের স্বীকৃতিরূপে নয়। কিন্তু অন্যদিকে মধ্যযুগের ইউরোপের যাজকরা নানারকমের সুবিধা ভোগ করলেও সেখানে যাজকের পদটি কিন্তু কখনোই বংশগত ছিল না। সুতরাং এক্ষেত্রে সাধারণভাবে বলা যেতে পারে যে, সামাজিক দিক থেকে সৈয়দরা তখন মুসলমান সমাজের অন্তর্ভুক্ত একটি বংশগত জাতি ছিলেন। আর ব্রাহ্মণরা তখন যেমন তাঁদের চিহ্নস্বরূপ উপবীত ধারণ করতেন, সৈয়দরাও তেমনি একটি বিশেষ ধরণের টুপি নিজেদের মাথায় দিতেন।
তাছাড়া ইসলাম ধর্মে পুরোহিত বা গুরুর বিশেষ কোন জায়গা না থাকলেও তখনকার বাস্তব জীবনে কিন্তু শেখ, পীর প্রভৃতি ব্যক্তিদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হত। বিশেষতঃ সুফীরা তখন নিজেদের ধর্মজীবনে অগ্রসর হওয়ার জন্য পীর বা মুরশিদ নামে পরিচিত গুরুর নির্দেশ মান্য করাকে অত্যাবশ্যক বলেই মনে করতেন। সুতরাং এদিক থেকে সেযুগের মুসলমানদের পীরের প্রতি আনুগত্য ও ভক্তি আসলে হিন্দুদের গুরু-ভক্তির সঙ্গেই তুলনীয় ছিল। এছাড়া সেযুগের কোন ব্যক্তি নিজের ধর্মজীবনে উন্নতি লাভ করলে প্রথমে পীর বলেই স্বীকৃতি লাভ করতেন। প্রথমদিকে এটা আসলে একটি বিশেষ কারণে একজন বিশেষ ব্যক্তির প্রতি সমাজের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন হলেও, ক্রমে এই প্রথা ব্যক্তিত্বকে অতিক্রম করে বংশকেই মুসলমান সমাজে বিশেষ মর্যাদার আসনে উন্নীত করে দিয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, হিন্দু সন্ন্যাসীদের মতোই পীরদের জন্যও বিবাহ নিষিদ্ধ ছিল না। কিন্তু এঁদের উভয়ের মধ্যে পার্থক্য ছিল যে, পীরের পুত্রকে তখন ‘পীরজাদা’ বলা হত, আর ধর্মজীবনে তাঁর কোন কৃতিত্ব না থাকলেও তিনি তাঁর পিতার প্রাপ্য মর্যাদার অধিকারী হতেন। একথার উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, দিল্লির সুলতান বহলুল লোদীর রাজত্বকালে সেযুগের বড় বড় আমিরেরা পর্যন্ত এসব পীরজাদাদের কাছে নিজেদের মাথা নত করে রাখতেন, এবং পীরজাদারা ইচ্ছা করলেই তাঁদের মাথার উপরে বসতে পারতেন। অনুরূপভাবে শেখদের বংশধরদের তখন ‘মখদুমজাদা’ বা ‘শেখজাদা’ বলা হত, এবং তৎকালীন মুসলমান সমাজে এই শেখজাদার মর্যাদা অনেকটা হিন্দুসমাজের ব্রাহ্মণের মতোই ছিল।
সেযুগে এসব সৈয়দ, পীর, পীরজাদা, এবং তখন যাঁরা সাধারণের কাছে ধর্মের রীতিনীতি ব্যাখ্যা করতেন, তাঁদের সাধারণভাবে ‘উলেমা’ বলা হত। সুলতানিযুগের ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বরনী তখনকার উলেমা শ্রেণীকে আবার দুটি ভাগে ভাগ করেছিলেন; যথা—(১) যাঁরা সবধরণের সাংসারিক প্রলোভন থেকে দূরে থাকতেন, এবং (২) যাঁরা সবধরণের পার্থিব ঐশ্বর্যের জন্য লালায়িত হতেন। অন্যদিকে ‘তারিখ-ই-ফখরউদ্দীন মুবারক শাহ’ গ্রন্থে বলা হয়েছিল যে—
‘উলেমা পয়গম্বরের উত্তরাধিকারী। তাঁরা মর্যাদায় এবং শ্রেণীবিন্যাসে অন্য সকলের থেকে অনেক উপরে। এমনকি শাসকরাও এদিক থেকে তাঁদের নীচে।’
এঁরা ছাড়া তখনকার অভিজাত-বংশীয় ব্যক্তি বা ‘উমরা’–রা সেযুগের মুসলমান সমাজের আরেকটি বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণী ছিলেন। এঁরা সেযুগের বড় বড় সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত হতেন এবং বড় বড় জায়গির ভোগ করতেন বলে ঐশ্বর্য আর জাঁকজমক তাঁদের জনসাধারণের কাছ থেকে পৃথক করে রাখত।
আর সেযুগের মুসলমান সমাজের নিম্নতম স্তরে ক্রীতদাসদের অবস্থান ছিল। তবে যদিও কোন কোন ক্ষেত্রে ক্রীতদাসেরা তখন উচ্চ রাজপদেও অধিষ্ঠিত হতেন, এমনকি শাসন ক্ষমতাও অধিকার করতেন, কিন্তু তবুও সেযুগের রাজনৈতিক ঘটনার আবর্তে এধরণের মুষ্টিমেয় ব্যক্তির ভাগ্য পরিবর্তন থেকে তখনকার বিরাট ক্রীতদাস শ্রেণীর সামাজিক অবস্থার সামগ্রিক পরিচয় পাওয়া যায় না। সেযুগে যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত হয়ে বন্দি হওয়া হিন্দুদের যেমন দাসে পরিণত করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হত, তেমনি আবার আফ্রিকা এবং পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া থেকেও বহু ক্রীতদাসদের তখন এদেশে আমদানি করা হত। এছাড়া ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও তখন ক্রীতদাস সংগ্রহ করা হত। সেকালে দিল্লি প্রভৃতি বড় বড় শহরে দাসদের বেচাকেনা করবার জন্য আলাদা বাজার ছিল। সুলতান আলাউদ্দীন খলজি তো তাঁর সময়কার নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণীর দাসদের বাজার দর পর্যন্ত ঠিক করে দিয়েছিলেন। আর এর পরবর্তীসময়ে দিল্লিতে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের প্রাসাদে প্রায় ৪০, ০০০ ক্রীতদাস ছিলেন বলে ইতিহাস থেকে তথ্য পাওয়া যায়। এদেশে সুলতানি আমলের মুসলমান সমাজে ক্রীতদাসরা মালিকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলেই গণ্য হতেন। এরফলে তখন স্বয়ং শাসকও যদি কোন অভিজাত ব্যক্তির ক্রীতদাসকে মুক্তি দিতে ইচ্ছুক হতেন, তাহলে প্রথমেই তাঁকে তাঁর মালিককে ক্রীতদাসের মূল্য বাবদ অর্থ মিটিয়ে দিতে হত। এছাড়া এসব ক্রীতদাসেরা তখন নিজস্ব কোন সম্পত্তি অর্জনের অধিকারীও ছিলেন না। বরং মুসলমান সমাজের ক্রীতদাসদের তুলনায় সমকালীন হিন্দুসমাজের চণ্ডালদের অবস্থা তখন অনেকটাই ভাল ছিল। কারণ, তাঁরা নিজেদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতেন না, তাঁরা নিজেদের বাড়িতে বাস করতেন, এবং নিজের সম্পত্তির মালিকানাই ভোগ করতেন। বস্তুতঃ সেযুগের হিন্দুসমাজের নিম্নশ্রেণীর মানুষের নিজের নিজের জাতির মধ্যেই নির্দিষ্ট সামাজিক মর্যাদা ছিল।
আর তৎকালীন হিন্দুসমাজের নিম্নস্তরের মানুষের মতোই সমকালীন মুসলমান সমাজের নিম্নস্তরেও বংশানুক্রমিক বৃত্তি অনুসারে মানুষের মধ্যে যে বিভিন্ন শ্রেণী প্রচলিত ছিল, ‘কবিকঙ্কণ চণ্ডী’ থেকে একথার প্রমাণ, এবং এঁদের বিস্তৃত একটা তালিকা পাওয়া যায়; যথা—গোলা, জোলা, মুকেরি (যাঁরা বিক্রয়যোগ্য জিনিষ আনা নেওয়ার জন্য বলদ ব্যবহার করতেন), পিঠারি, কাবারি (মৎস্য বিক্রেতা অথবা কসাই), সানাকার, হাজাম, তীরকর, কাগজী (যাঁরা কাগজ তৈরি করতেন), বেনটা (যাঁরা বয়ন করতেন), রংরেজ (যাঁরা রঙ লাগাতেন), হালান, এবং কসাই। এখানে বলাই বাহুল্য যে, এসব পেশায় নিযুক্ত অসংখ্য মানুষরা কিন্তু সেযুগের তথাকথিত বর্ণ-বৈষম্যহীন মুসলমান সমাজে কখনোই বনেদি মুসলমানদের সমপরিমাণ মর্যাদার অধিকারী হতে পারেননি।
এমনকি তখনকার উচ্চশ্রেণীর মুসলমানদের মধ্যেও জাতিভিত্তিক বিভেদ প্রবল ছিল। যেমন—খলজিরা মূলতঃ তুর্কি হলেও দীর্ঘকাল আফগানিস্তানে বসবাস করবার ফলে তাঁরা কখনোই খাঁটি তুর্কিদের কাছে মর্যাদা পাননি। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, জলালউদ্দীন খলজি তুর্কি জাতীয় সুলতান গিয়াস-উদ্দীন বলবনের বংশের হাত থেকেই দিল্লির সুলতানি মসনদ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। আর এই ঘটনা সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে সুলতানিযুগের ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বরনী তখন বলেছিলেন যে—
‘তুর্কীরা চিরকালের জন্য রাজশক্তি হারাল।’
এরপরে খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বহলুল লোদীর নেতৃত্বে পাঠান বা আফগানরা দিল্লির মসনদ অধিকার করে নিয়েছিলেন। আর তারপরে ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে জয়লাভ করে বাবর ভারতে মোঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তিস্থাপন করলেও এর কয়েক বছর পরে শেরশাহ এদেশে আফগান-প্রভুত্বকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অবশেষে ১৫৫৬ সালে পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধের ফলে দিল্লিতে পুনরায় স্থায়ীভাবে মোঘল-শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও, এরপরে বাংলা এবং উড়িষ্যাতে আকবরকে কিন্তু দীর্ঘকাল ধরেই আফগানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। আলোচ্য প্রসঙ্গে স্মরণীয় যে, নিজেদের বংশধারার একদিক থেকে মোঘলরা তুর্কি জাতীয় ছিলেন।
এছাড়া তুর্কি, পাঠান এবং আরবজাতীয় সৈয়দ ও শেখ শ্রেণীভুক্ত উচ্চস্তরের মুসলমানেরা তখন নিম্নস্তরের মুসলমানদের সঙ্গে কোন বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করতেন না। আর এসব তথ্য থেকে একথাই প্রমাণিত হয় যে, হিন্দুদের জাতিভেদ প্রথার মতোই এদেশের মুসলমান সমাজেও তখন সামাজিক বৈষম্য প্রচলিত ছিল। তবে এবিষয়ে পার্থক্য হল যে, হিন্দুসমাজের তুলনায় মুসলমান সমাজে এই বৈষম্যের কঠোরতা তখন অপেক্ষাকৃত কম ছিল।
কিন্তু এসব ছাড়া সেকালের ভারতে আগত বহিরাগত মুসলমান এবং ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যেকার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেও ঐতিহাসিকেরা মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বলে মনে থাকেন। আর এপ্রসঙ্গে প্রথমেই স্মরণীয় যে, সমগ্র সুলতানি আমলের ইতিহাসে একজনমাত্র ভারতীয় মুসলমানেরই দিল্লিতে উজিরের পদে আসীন হওয়ার সংবাদ পাওয়া যায়। এছাড়া এমনকি পরবর্তীসময়েও, খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দিল্লির মোঘল দরবারে ইরানি, তুরানি এবং হিন্দুস্থানী ওমরাহদের মধ্যে প্রবল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাই এদেশে মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের পথকে প্রশস্ত করেছিল বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।
তাছাড়া আলোচ্য প্রসঙ্গে একথাও উল্লেখ্য যে, সুলতানি আমলের ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বরনীও নিজের লেখনীতে তাঁর সময়কার ভারতের উচ্চশ্রেণীর মুসলমান এবং নিম্নশ্রেণীর মুসলমানের মধ্যেকার পার্থক্যের উপরে জোর দিয়েছিলেন বলেই দেখতে পাওয়া যায়। এমনকি সেযুগের ‘উলেমা’ শ্রেণীর প্রতিনিধি এই ঐতিহাসিক তাঁর লেখায় তখনকার ভারতের নিম্নশ্রেণীর মুসলমানদের প্রতি নিজের সুস্পষ্ট অবজ্ঞাও গোপন করেননি। আর তাঁর প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, সুলতানি আমলের ভারতে ধর্মান্তরিত হিন্দুরাই নিম্নশ্রেণীর মুসলমান বলে গণ্য হতেন; এবং একারণেই সেযুগের অভিজাত মুসলমান সমাজে তাঁদের কোন জায়গা তো ছিলই না, এমনকি তখনকার উচ্চ রাজপদগুলিতে তাঁদের কোন অধিকারও ছিল না। এজন্যই কয়েকজন উচ্চপদস্থ মুসলমান রাজকর্মচারীর অনুরোধ সত্ত্বেও সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন তাঁর সময়কার একজন হিন্দু ক্রীতদাসের ধর্মান্তরিত পুত্রকে নিজের প্রশাসনে কেরানির পদেও নিযুক্ত করতে কোনভাবেই স্বীকৃত হননি।
সুতরাং এসব ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করে স্পষ্টভাবেই নিঃসন্দেহে একথা বলা যেতে পারে যে, আলোচ্যযুগের মুসলমান সমাজ প্রকৃতপক্ষে বর্ণ-বৈষম্যহীন তো ছিলই না, এবং এমনকি ধর্মান্তরিত হিন্দুরা তখনকার সেই সমাজে বহিরাগত মুসলমানদের তুলনায় নিম্নস্তরেই ছিলেন। আর খুব সম্ভবতঃ একারণেই ধর্মান্তরিত হিন্দুরা তখন অনেকক্ষেত্রেই নিজেদের হিন্দু পূর্বপুরুষদের কথা গোপন করে তুর্কি বা পাঠানদের বংশধর বলে দাবি করতেন। তবে এভাবে মিথ্যা দাবি করে ধর্মান্তরিত হিন্দুদের মুসলমান সমাজের উচ্চস্তরে প্রবেশের প্রচেষ্টা শুধুমাত্র মধ্যযুগে নয়, বরং এরপরেও লক্ষ্য করা গিয়েছিল, এবং এমনকি বর্তমান যুগেও লক্ষ্য করা যায়। প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, এই মনোভাবের জন্যই খৃষ্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে উর্দু ভাষাকে বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বলে চালাবার একটা চেষ্টা হয়েছিল। আর সেযুগের অবস্থাপন্ন বাঙালি মুসলমানেরা তখন বিহার এবং উত্তরপ্রদেশের উর্দুভাষী মুসলমানদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করবার জন্য যে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, তা আদতে তাঁদের অতীতের এই হীনমন্যতারই দীর্ঘকালের অর্ধবিস্মৃত স্মৃতির সঙ্গে জড়িত ছিল। বাস্তবে বাঙালি মুসলমানদের পূর্বপুরুষেরা মধ্যযুগের ভারতে আগত ইরানি-তুরানি-আফগানিস্তানী ভাগ্যাম্বেষীদের কাছে কখনোই নিজেদের যোগ্য মর্যাদা পাননি বলেই সেসময়ে এবং এমনকি পরবর্তীকালেও কৌশলেই তাঁরা এসব বিদেশীদের সুরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করবার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। আর এরপরে ইংরেজ আমলে পৌঁছেও বাঙালি মুসলমানরা যে এই দুঃস্বপ্নের জট থেকে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করতে পারেন নি, একথার প্রমাণও ইতিহাসে পাওয়া যায়।
(আগামী পর্বে সমাপ্ত)
বি.দ্র.
প্রতিবেদক একজন ইতিহাস সংরক্ষক, লেখক ও বুদ্ধি জীবী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category