বিনোদন ডেক্স :
জাহাঙ্গীর যখন যুবরাজ সেলিম। হারেমের সুন্দরী এক নর্তকীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ সম্রাট আকবর নাম রেখেছিলেন ‘আনারকলি’, যুবরাজ সেলিম তাঁর প্রেমে পড়েন। তাঁদের এই সম্পর্কের কথা সম্রাট আকবর জানতে পারলে, পিতা পুত্রের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। সম্রাট আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়ার নির্দেশ দেন। গল্প নাটক নভেল চলচ্চিত্রে বারবার এই প্রেমকাহিনী মানুষকে আকর্ষণ করেছে।
কিন্তু, আনারকলির সমাধির অস্তিত্ব আছে, যা পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থিত। যদিও আনারকলির অস্তিত্ব এবং তাঁর প্রেম কাহিনির সত্যতা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানান বিতর্ক আছে।
মোগল যুগের ঐতিহাসিক ভবন লাহোরের পাঞ্জাব সিভিল সেক্রেটারিয়েট কমপ্লেক্সে আনারকলির সমাধি আছে। সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর ভালোবাসার স্মরণে এই সমাধি নির্মাণ করিয়েছিলেন, এটাও ঐতিহাসিকভাবে সত্য। এই সমাধি নিশ্চিত প্রমাণ আনারকলি কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়। তবে জাহাঙ্গীরের সমসাময়িক বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ ছাড়া আর কেউ আনারকলির কথা লেখেননি। সেজন্য কাল্পনিক চরিত্র বলে উপেক্ষা করা হয়েছে। এছাড়াও ওই ঐতিহাসিক সৌধ একাধিকবার কখনও বাসগৃহ, কখনও গীর্জা, কখনও অফিস গৃহ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের আর্কাইভ হিসাবে ভবনটি ব্যবহার করা হয়।জনসাধারণের প্রবেশাধিকার সীমিত।
গোপনীয়তার প্রতি মানুষের স্বাভাবিক কৌতুহল থাকায় চলচ্চিত্র ছাড়াও নানান কাহিনির পল্লবিত শাখাপ্রশাখায় আনারকলি এখনও জীবন্ত আছেন ইতিহাসের গল্প প্রেমীদের কাছে।
একইভাবে আজিমুন্নিসা বেগমকে জীবন্ত কবর দেওয়া নিয়ে আরও নানা গল্প ও রহস্য আছে।
প্রতি রাতে তিনি নাকি কোনো না কোনো পুরুষের সঙ্গে দৈহিক মিলনে লিপ্ত হতেন। এ কথা যাতে কেউ জানতে না পারে সেইজন্য দৈহিক মিলনের পর খাবারে বিষ প্রয়োগ করে সেই পুরুষকে হত্যা করতেন।
নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ, মেয়ের এই কীর্তির কথা জানতে পেরে মেয়েকে জীবন্ত সমাধিস্থ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, এসব গল্পও শোনা যায়।
যদিও অনেকেই বলেছেন, আজিমুন্নেসা অত্যন্ত স্বাধীনচেতা প্রকৃতির ছিলেন। স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিনিয়ত তাঁর মতবিরোধ লেগে থাকত। তিনি সুজাউদ্দিনের রাজকীয় কাজকর্মেও নাক গলাতেন।
নবাব হওয়ার কিছুদিন পর বিহারের শাসনভার এসেছিল সুজাউদ্দিনের হাতে। তিনি হয়েছিলেন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব। কিন্তু দুই পুত্র সরফরাজ ও তকী খাঁর মধ্যে কাকে বিহারের সুবাদার নিযুক্ত করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।
নিজের পুত্র সরফরাজকে পাটনায় পাঠাতে রাজি ছিলেন না আজিমুন্নেসা বেগম। আবার নিজের বোন সতীন পুত্র মহম্মদ তকীকেও ঈর্ষাজনিত কারণে বিহারের সুবাদার হিসেবে নিযুক্তিতে অমত প্রকাশ করেন।
নবাব সুজাউদ্দিন স্ত্রীর অমতে কিছু করতে পারেন না।
সেজন্য স্থির করলেন আলিবর্দী খানকেই পাঠাবেন। আজিমুন্নেসা প্রস্তাবে এক কথায় রাজি।
আলিবর্দী খানকে ডেকে পাঠিয়ে বলে দেন, তোমাকে বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হল। কাজকর্ম ঠিকঠাক করবে! কথাগুলো এমনভাবে বলেন, যেন তিনিই এই সিদ্ধান্তের হোতা! এরকম ছিল তাঁর প্রকৃতি।
কিন্তু কিছুকালের মধ্যেই দেখা যায় নবাব সুজাউদ্দিন
শাসনকার্যে অতিমাত্রায় অধীনস্থ কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছেন। বিশ্বস্ত রাজকর্মচারীরা তাঁর চারিত্রিক দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে তৎপর হয়ে ওঠে।
হাজী আহমদ, আলম চাঁদ এবং জগৎ শেঠ ফতেহ চাঁদের উপর প্রশাসনিক দায়ভার ন্যস্ত ছিল।
এরা এমন ষড়যন্ত্র করে যে সুজাউদ্দিনের দুই পুত্র সরফরাজ খান ও তকী খানের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কে ফাটল ধরে, দুজনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়।
১৭৩৩ সালে নবাব সুজাউদ্দিনকে দেখা যাচ্ছে,
তিনি বেশ কিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার মিলিত সুবাদার হিসেবে তিনি সংযুক্ত ভূখণ্ডকে চারটে প্রশাসনিক বিভাগে ভাগ করেছিলেন। কেন্দ্রীয় বিভাগের মধ্যে ছিল পশ্চিমবাংলা, উত্তর বাংলা এবং মধ্য বাংলা। ঢাকা বিভাগের মধ্যে ছিল দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলার অংশ, উত্তর বাংলার একটি ছোট অংশ সহ চট্টগ্রাম ও সিলেট।
উড়িষ্যা এবং বিহার ছিল পৃথক।
কেন্দ্রীয় বিভাগ বলতে বাংলা শাসিত হয়েছে তাঁর মনোনীত উপদেষ্টামন্ডলীর সহায়তায় সরাসরি নবাবের হাতে। অন্যান্য বিভাগগুলো এক একজন নায়েব নাজিম বা নায়েব সুবাহদাররা দায়িত্বে থাকতেন।
এরপর নবাব সুজাউদ্দিন
তাঁর চারপাশের কেন্দ্রীভূত শক্তির মধ্যে ক্ষমতা পুনর্বণ্টন করেছিলেন।
বড় ছেলে সরফরাজ খানকে দিয়েছিলেন বাংলা সুবাহের নাজিম-এর (দেওয়ান) দায়িত্ব।
ছোটো ছেলে মুহাম্মদ তাকিকে ওড়িশার নায়েব-এর (ডেপুটি সুবাহদার) পদ।
জামাই মুর্শিদকুলী খান (দ্বিতীয়) কে ঢাকার নায়েব নাজিম নিযুক্ত করেছিলেন।
ছোটো জামাই মির্জা লুৎফুল্লাহকে করেছিলেন নায়েব (উপ) নাজিম।
আলিবর্দী খানের ভাই হাজী আহমেদকে করেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা।
নওয়াজিশ মুহাম্মদ খান, মীর বকশী (মাস্টার জেনারেল)
সৈয়দ আহমেদ খান হয়েছিলেন রংপুরের ফৌজদার।
জয়েন আহমেদ খান হয়েছিলেন রাজমহল, আকবর নগরের ফৌজদার।
পীর খান হয়েছিলেন হুগলির ফৌজদার।
আলীবর্দী খান পাটনা অর্থাৎ আজমাবাদের নায়েব সুবাহদার হলেও তাঁর সঙ্গে বড় ছেলে সরফরাজ খানকে জুড়ে দিয়ে করেছিলেন ডেপুটি সুবাহদার।
এছাড়াও
ছোট জামাই মির্জা লুৎফুল্লাহকে জুড়ে দিয়েছিলেন ওড়িশার উপ নায়েব সুবাহদার হিসেবে।
উড়িষ্যার দেওয়ান আলম চাঁদকে (পরবর্তীকালে রায় রায়ান) মুর্শিদাবাদের খাল্সা ভূমির দেওয়ান নিযুক্ত করেছিলেন।
মুহম্মদ তকীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় মুর্শিদকুলী খানকে উড়িষ্যায় বদলি করেছিলেন এবং তাঁর স্থলে ঢাকার নায়েব নাজিম নিযুক্ত করেছিলেন সরফরাজ খান। সরফরাজ কখনই ঢাকায় বসবাস করেন নি। তিনি তাঁর উপদেষ্টা সৈয়দ গালিব আলী খানের মাধ্যমে ঢাকা শাসন করতেন।
দায়িত্ব বন্টন করার ফলে প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রভূত পরিবর্তন হয়। এবং এই পরিবর্তন সমসাময়িক রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটায়।
ফলে তাঁর অবস্থানের ক্ষেত্রটি নিরাপদ হয় এবং বড় ধরনের স্থায়ীত্ব এনে দেয়।
দেখা গেল—
বাংলার জমিদারদের মধ্যে বীরভূমের আফগান জমিদার বদিউজ্জামান কিছুদিন অশান্তি পাকাবার চেষ্টা করলে, আলীবর্দী ও সরফরাজ খান মিলিতভাবে তাঁকে দমন করেন।
জমিদারদের সঙ্গে নতুনকরে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন সুজাউদ্দিন।
মুর্শিদকুলি খানের সময়ে যারা কারারুদ্ধ হয়েছিলেন, তাদের দিলেন মুক্তি। যে সব রাজকর্মচারী রাজস্ব আদায়কালে প্রজাদের উপর নির্যাতন চালাতেন, তাদের বিরুদ্ধে নিলেন কড়া ব্যবস্থা। প্রজাদের ওপর আবওয়াব খাজনা আদায় অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, নবাব জমিদারদের সেই আবওয়াব আদায় থেকে বিরত করলেন। তাঁর এইসব কাজ তাঁকে বিপুল জনপ্রিয়তা এবং প্রচুর মুনাফা এনে দেয়।
জমিদারদের কাছ থেকে প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেড় কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে সবটাই পাঠিয়ে দিলেন দিল্লির রাজ কোষাগারে। এমনিতেই সম্রাট মুহম্মদ শাহ তাঁর উপর খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন, আরও খুশি হলেন। তাঁকে ‘মুতামান-ই-মুলক সুজাউদ্দৌলা আসাদ জং’ উপাধিতে ভূষিত করলেন।শায়েস্তা খানের শাসনামলের দীর্ঘকাল পরে বাংলায় আবার চালের দাম কমে গিয়েছিল।ছবিতে আনারকলি ও শাহজাদা সেলিমের ছবি।
তথ্যসূত্র ওছবি : উইকিপিডিয়া ও ইন্টারনেট।