ডেক্স রিপোর্ট :
১৯৭১’র ১৬ ডিসেম্বরের সকাল। ঢাকা তখন ঘিরে রেখেছে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা, আর জেনারেল আমির আবদুল্লা খান নিয়াজির নেতৃত্বে প্রায় সাতাশ হাজার পাকিস্তানি সেনা ক্যান্টনমেন্টে। যুদ্ধের শেষ ঘনিয়ে আসছে, আর সে সময়ই একটা হেলিকপ্টারে চেপে পকেটে পিস্তল ঝুলিয়ে তেজগাঁওয়ের কাছে এসে নামলেন মেজর জেনারেল জ্যাকব-ফার্জ-রাফায়েল জ্যাকব, কলকাতায় ভারতীয় সেনার ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান। সঙ্গে মাত্র দুজন দেহরক্ষী – কোনও সেনা ব্যাটেলিয়ন পর্যন্ত নয়।
আত্মসমর্পণের দলিলের একটা খসড়াও নিজের হাতে লিখেছিলেন জ্যাকব– দিল্লির সঙ্গে কোনও পরামর্শ না করেই! দাবি ছিল, ঢাকার প্রকাশ্য স্থানে হাজার হাজার মানুষের সামনেই পাকিস্তানি সেনাদের নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করতে হবে। কারণ যে ঢাকার মানুষের ওপর এতদিন তারা চরম অত্যাচার করেছেন, তাদের চরম অপমানটাও হতে হবে সেই মানুষগুলোর চোখের সামনে।
কিন্তু নিয়াজি প্রশ্ন তুললেন, ‘কীসের আত্মসমর্পণ? আমরা তো যুদ্ধবিরতি চাই!’
পাকিস্তানি জেনারেলের আশা ছিল, সেই যুদ্ধবিরতিটাও হবে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে। তখন জাতিসংঘের অধিবেশন চলছে নিউইয়র্কে, পাকিস্তানি কূটনীতিকরা জোর তদবিরও চালাচ্ছেন। কিন্তু জ্যাকব ওসবের ধার ধারলেন না। সোজা জানিয়ে দিলেন ‘যুদ্ধবিরতি-ফিরতি মানা যাবে না, এই আত্মসমর্পণের দলিল আধঘণ্টার মধ্যে মেনে নিন। নইলে ঢাকায় আমরা এক্ষুণি বম্বিং শুরু করব। আর মেনে নিলে আপনার সব সেনার সুরক্ষার দায়িত্ব আমার। তাদের গায়ে কেউ হাত দেবে না!’
নিয়াজি তখনও হতভম্ব হয়ে বসে। জ্যাকব তখন দলিলের খসড়াটা তিনবার তার চোখের সামনে দোলালেন। বললেন, ‘আপনি চুপ করে থাকলে আমি ধরে নিচ্ছি আপনারা এটা মেনে নিচ্ছেন।’ বলেই ব্যাস কোমরে পিস্তল ঝুলিয়ে যেমন নাটকীয়ভাবে ঢুকেছিলেন, সেভাবেই বেরিয়ে গেলেন।
একটু বাদে, বিকেল পাঁচটা বাজতে পাঁচ মিনিটে রমনা ময়দানে স্বাক্ষরিত হল আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক সেই দলিল। ভারতের লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে নিজের পিস্তল তুলে দিয়ে পাকিস্তানি জেনারেল এ কে নিয়াজি তার বাহিনীকে নিয়ে জনসমক্ষে আত্মসমর্পণ করলেন। যে ঘটনার তুলনা সারা পৃথিবীর সামরিক ইতিহাসেই বিরল।
আর এই গোটা ঘটনার পেছনে রয়ে গেল জ্যাকবের ধুরন্ধর চাল আর বেপরোয়া সাহসের স্বাক্ষর। যেটাকে অনেক সামরিক গবেষক পরে ‘ব্রাভাডো’ বলেই বর্ণনা করেছেন।
কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা জেনারেল জ্যাকব নিয়াজিকে বুঝতেই দেননি ঢাকায় তার হাতে মাত্র হাজার তিনেক সেনা ছিল। শুধু ঢাকাতেই পাকিস্তানি সেনার সংখ্যা তখন ভারতীয় সেনার প্রায় নয়গুণ! সাতাশ হাজারের কাছাকাছি। আত্মসমর্পণ না-করেও তারা অনায়াসে আরও অন্তত দুসপ্তাহ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারত। ততদিনে জাতিসংঘের আলোচনায় কী ফল হয় অপেক্ষা করা যেত তার জন্যও। কিন্তু জ্যাকব এমন একটা ধারণা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন যে ঢাকার পতনের আর এতটুকুও দেরি নেই। আত্মসমর্পণ না করলে জেনারেল নিয়াজি ও তার সঙ্গীদের মৃত্যু অবধারিত।
আর এ কারণেই ভারতের বিখ্যাত সামরিক গবেষক ও ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের কর্ণধার, সাবেক মেজর জেনারেল দীপঙ্কর ব্যানার্জি মনে করেন– জ্যাকব নিয়াজির সঙ্গে যা-করেছিলেন তা বিশ্বের সামরিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ‘ব্লাফ’ বা ‘ধোঁকা’গুলোর একটা।
তিনি বলছিলেন, ‘এমন একটা ব্লাফ দিয়ে তিনি পাকিস্তানিদের ওপর সাংঘাতিক একটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করতে পেরেছিলেন। যে কারণে তারা বেশ অপ্রত্যাশিতভাবেই আত্মসমর্পণে রাজি হয়ে যায়। তারা বোঝেওনি যে ভারতের সঙ্গে মাত্র তিন হাজার সেনা আছে। এর পেছনে আমি পুরো কৃতিত্ব দেব জ্যাকবের বুদ্ধিমত্তাকেই। কারণ পাকিস্তানিদের কিন্তু তখন সারেন্ডার না করলেও চলত।’
পরে যুদ্ধের তদন্তে গঠিত পাকিস্তানে জাস্টিস হামিদুর রহমান কমিশন যখন নিয়াজিকে প্রশ্ন করেছিল প্রায় সাতাশ হাজার সেনা সঙ্গে নিয়েও তিনি কেন আত্মসমর্পণ করলেন, তখন নিয়াজি বলেছিলেন ‘জ্যাকব আমায় ব্ল্যাকমেল করেছে, আমার পরিবারকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারার হুমকি দিয়েছে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। জেনারেল জ্যাকব নিজে অবশ্য তার বইতে এগুলোকে স্রেফ ‘আজেবাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
গোটা যুদ্ধেই জেনারেল জ্যাকব এমন অনেকগুলো ফাটকা খেলেছিলেন। যার অনেকটাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে এবং তার বেশিরভাগই খেটে গিয়েছিল। জ্যাকবের ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা’ ও নিজের স্মৃতিকথাতেও তার অনেক উল্লেখ আছে।
জেনারেল জ্যাকব পরে নিজেও বলেছেন, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছিল খুলনা আর চট্টগ্রাম দখলে জোর দিতে। সেটা না-শুনে তিনি সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করেছিলেন ঢাকায়। বর্ষায় অসুবিধে হবে বুঝে নভেম্বরের আগে যুদ্ধ শুরুই করতে চাননি। চীন সীমান্ত থেকে ঝুঁকি নিয়ে সরিয়ে এনেছিলেন তিন ব্রিগেড সেনাকে। এগুলো কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল, তা নিয়ে ভারতে সামরিক গবেষকরা আজও তর্ক করে থাকেন, কিন্তু বাংলাদেশ যুদ্ধে জেনারেল জ্যাকবের ভূমিকাকে উপেক্ষা করতে পারেন না কেউই।
ইরাকের বাগদাদ থেকে বহু বহু বছর আগে জ্যাকবের ইহুদি পরিবার কলকাতায় ব্যবসা করতে এসেছিল এবং রীতিমতো সম্পন্ন এই পরিবারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর কোনও যোগ ছিল না কস্মিনকালেও। ফলে জ্যাকব যখন মাত্র আঠারো বছর বয়সে অবিভক্ত ভারতের ব্রিটিশ সেনায় যোগ দিয়েছিলেন, তার বাবা মোটেও খুশি হননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ও ১৯৬৫’র ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধেও লড়েছেন তিনি। কিন্তু তাকে যেটা ভারতের সামরিক ইতিহাসে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে দিয়েছে, সেটা হল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকাতে পাকিস্তানি সেনার আত্মসমর্পণ!