মীর জুমলার জীবন শুরু হয়েছিল সুদূর পারস্যের ইস্পাহানের আর্দিস্তান অঞ্চলে। তেল ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম হয়েছিল, প্রথম জীবনে নাম ছিল মুহম্মদ সাঈদ।
ছোটোবেলায় লেখাপড়ার প্রতি ভালো আগ্রহ ছিল। দারুণ অংক কষতে পারতেন। গণিত বিষয়ে এবং হিসাব-নিকাশের কাজে পারদর্শীতার জন্য তিনি পারস্যের এক হীরক ব্যবসায়ীর অধীনে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
কিন্তু এই চাকরি বেশিদিন করেননি।
এক ঘোড়া ব্যবসায়ীর কাছে চাকরি নিয়েছিলেন। ঘোড়া ব্যবসায়ী ভারতবর্ষের গোলকুণ্ডা অঞ্চলে ঘোড়া রপ্তানি করতেন।
ঘোড়া ব্যবসার সূত্র ধরে অনুমান ১৬১৫-২৫ সালের কোনো এক সময়ে তিনি ভারতে এসে গোলকুণ্ডা অঞ্চলে স্থানীয় এক হীরে ব্যবসায়ীর কাছে কাজ নিয়েছিলেন।
ভারতবর্ষে গোলকুণ্ডা তখন বিখ্যাত হীরক রাজার দেশ বলে। এখানে হীরের খনিতে কাজকর্ম চলছিল। আর দেশ বিদেশের হীরের ব্যবসায়ীদের আড্ডা।
গোলকুন্ডায় কাজ করতে করতে হীরে ব্যবসার সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয় মীর জুমলা আয়ত্ত করেন।
তারপর একদিন নিজেই হীরের কেনাবেচা শুরু করে দেন।
হীরের ব্যবসায় প্রচুর মুনাফা অর্জন করার ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে তাঁর আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়। সাথে সাথে সামাজিক প্রতিপত্তি পদমর্যাদা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।
হীরে ব্যবসার সুবাদে রাজা মহারাজা নবাব বাদশা— সমাজের একেবারে উচ্চস্তরের মানুষের মধ্যে তাঁর যাতায়াত বেড়ে যায়। ঠিক এই সময়ে
অভাবিত একটি চাকরির সুযোগ এসে যায় তাঁর জীবনে— মসুলিপত্তনম-এর প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার সুযোগ।
মসুলিপত্তনম বা মছিলিপট্টনমও তখন ভারতবর্ষের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর।
দেশ বিদেশের জাহাজের আনাগোনা। দক্ষতার সাথে বন্দরের বিভিন্ন কাজকর্ম পরিচালনা করতে করতে রাজদরবারের সভাসদের সাথে মীর জুমলার ওঠা-বসা শুরু হয়।
গোলকুণ্ডার সুলতান তখন আব্দুল্লাহ কুতুব শাহ। তিনি মীর জুমলার ব্যক্তিত্ব এবং কাজকর্মে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে গোলকুণ্ডায় ফিরিয়ে এনে নিযুক্ত করলেন নিজের দরবারে সার-ই-খাইল অর্থাৎ উজির।
মীর জুমলার পরামর্শ ছাড়া সুলতান আব্দুল্লাহ কুতুব শাহ কোনো কাজ করতেন না।
উজির থাকা কালীন মীর জুমলা কিন্তু নিজের হীরের ব্যবসা ছাড়েন নি। পদমর্যাদা এবং হীরের ব্যবসায় একচেটিয়া আধিপত্যে অল্পদিনের মধ্যেই তিনি হয়ে গেলেন লব্ধপ্রতিষ্ঠ ধনকুবের।
জানা যায়,
তাঁর কোষাগারে সঞ্চিত হীরের ওজন ছিল প্রায় ২০ মণ! এছাড়াও তাঁর ১০টি জাহাজ ছিল। ইংরেজ, ডাচ নাবিকরা সেগুলো পরিচালনা করতেন। এইসব জাহাজে বার্মা, আচেহ, মালদ্বীপ, পারস্য এবং আরব সাম্রাজ্যের বিভিন্ন দেশে মীর জুমলার বাণিজ্য চলত। ভারতের তৈরি সুতো রপ্তানি করে তাঁর লোকজন মূল্যবান চুনি, মুক্তা, মশলা এবং চাল সংগ্রহ করতেন ।
এইরকম সময়ে দক্ষিণ ভারতের ছোটো ছোটো রাজ্যগুলোর মধ্যে তীব্র বৈরীতা শুরু হয়েছিল।
কিন্তু গোলকুন্ডার সুলতানের সেনাবাহিনীর তুলনায় সেইসব রাজ্যগুলো মোটেও শক্তিশালী ছিল না।
তাদের অনৈক্যের সুযোগে মীর জুমলা ১৬৪৬ সালে এদের আক্রমণ করে, অনায়াসে রাজ্যগুলি দখল করে নিলেন।
নেলোর, তিরুপতি, সেন্ট জর্জ ফোর্ট সুলতানী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।
মীর জুমলার এই বিজয় অভিযানের উল্লেখযোগ্য ঘটনা দুর্ভেদ্য গান্দিকোটা দুর্গ দখল করা। এই দুর্গ দখল করার জন্য দক্ষিণ ভারতে মীর জুমলার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
সুলতান আব্দুল্লাহ কুতুব শাহ-র বিশ্বস্ত উজির মীর জুমলা হয়ে গেলেন দিগ্বিজয়ী সেনাপতি। তাঁর প্রতিপত্তি, সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি হয়েছিলেন অঢেল বিত্তের অধিকারী।
গুজব রটে যায়—
সাম্রাজ্যের আসল কাণ্ডারি মীর জুমলা। সুলতান নন।
সন্দেহপ্রবণ সুলতান
মীর জুমলার উপর নজরদারি এবং ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলেন। সুলতানের আচরণে মীর জুমলা দুঃখ পান। একসময় তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিজের দেশে ফিরে যাবার কথাও ভাবতে শুরু করেন।
কিন্তু মীর জুমলার কপাল ছিল মন্দ,
দাক্ষিণাত্যে তখন উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন মোগল সাম্রাজ্যের সুবেদার শাহজাদা আওরঙ্গজেব।
তিনি মীর জুমলার গান্দিকোটা দুর্গ দখলের গল্প শুনেছিলেন এবং বলতে গেলে তখন তিনি তাঁর গুণমুগ্ধ ফান।
সুলতান আব্দুল্লাহ কুতুব শাহ-র সাথে মীর জুমলার রেষারেষির কাহিনিও তাঁর কানে এসেছিল। আওরঙ্গজেব তাঁকে প্রস্তাব দিলেন মোগল সাম্রাজ্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার জন্য।
মীর জুমলা কী করবেন?
ছবি সৌজন্যে কালের কণ্ঠ।
‘মীর জুমলার গেট’। ঢাকার সীমানা চিহ্নিত করতে ১৬৬০ থেকে ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাংলার সুবাদার এই তোরণ নির্মাণ করেন। গড়েন গেটসংলগ্ন এলাকায় নয়নাভিরাম বাগান ‘বাগ-ই-বাদশাহি’।