সংগৃহিত তথ্য( দৈনিক জনতার দেশ):
প্রাকৃতিক কারণে সাগর উত্তাল।দেয়াঙে পৌঁছার পর শাহ সুজাকে অভ্যথণা জানান আরাকান রাজ্যের চট্টগ্রামের শাসনকতা।পরিচয়সুত্রে শাহসুজা চট্টগ্রামের শাসনকতাকে একটি স্বণখুচিত তরবারি উপহার দেন।উল্লেখ্য যে খানিকটা শান্তি আর নিরিবিলি জীবনের আশায় আরাকান যাওয়াই ছিল শাহ সুজার জীবনের এক চরম ভ্রান্তিজনক অধ্যায়।
বষাকাল শেষ হতে দীঘসময়। অতপর বাধ্য হয়ে শাহসুজা বিশাল বাহিনী নিয়ে দেয়াঙের ‘পশ্চিমচাল’ নামক স্থানের বিস্তিন্ন এলাকাজুড়ে দুর্গ ও তাবু স্থাপন করে দিনযাপন করতে থাকেন। শাহ সুজা ঐ সময়ে পশ্চিমচাল গ্রামে (ভক্তিয়া পাড়া) একটি মসজিদ নিমাণের কাজও শুরু করেন। মসজিদটির নামকরণ করেন তাঁর পুব পুরুষ আকবরের নামানুসারে ‘আকবরী মসজিদ’।
এদিকে আওরঙ্গজেবের প্রধান সেনাপতি মীরজুমলা আরাকানের রাজাকে চাপ প্রযোগ করতে থাকেন, যেন শাহ সুজাতে তার হাতে হস্তান্তর করেন।নচেৎ আরাকান রাজ্য আক্রমণের হুমকি দেয়। মীরজুমলার হুমকির কারণে আরাকানের কেন্দ্রীয় রাজা শাহসুজাকে আরাকানের রাজধানীতে স্থান্তরের সিদ্ধান্ত জানালে তিনিও পরিবার পরিজন নিয়ে দেয়াঙ থেকে আরাকানের রাজধানীতে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্তের আলোকে প্রধান সেনাপতি ফতে খাঁ’র নেতৃত্বে সেনাবাহিনী শঙ্খ নদীর দক্ষিণ তীর থেকে নাফ নদীর তীর পযন্ত পাহাড়ি জঙ্গল পরিস্কার করে ২২ হাত ছওরা একটি পথ নির্মাণ করেন। ঐ পথ দিয়েই শাহ সুজা দেয়াঙ থেকে আরাকানে চলে যাবেন। দেয়াঙ থেকে দু’দলে বিভক্ত অগ্রগামী সেনাদলের নেতত্বে ছিলেন প্রধান সেনাপতি ফতে খাঁ, সেনাপতি শেরমস্ত খাঁ, সেনাপতি গোলাম হোসেন খাঁ। দ্বিতীয় দলে ছিলেন স্বয়ং শাহ সুজা, তাঁর নিকট আত্মীয় স্বজনসহ বিশাল মোগল বাহিনী। পথিমধ্যে তারা একটি পাহাড়ি এলাকায় রাত যাপন করেন, ঐ এলাকাটিকে তিনি চুনকিয়া নামে অবহিত করেন, পরবতীতে ঐ এলাকার নামকরণ হয়ে যায় চুনতি। চুনতি বতমান লোহাগড়া উপজেলার একটি ঐতিহাসিক স্থান। পরদিন ঐ এলাকা ত্যাগকালে শাহ সুজা তাঁরই সহযোদ্ধা পীর বংশের লোকজনকে তার সাথে না গিয়ে ঐ এলাকায় থেকে যেতে বললেন। তারা ঐ এলাকায় থেকে যান। বতমানে শাহ সুজার পীর বংশের পরবতী বংশধররা ঐ এলাকায় বসবাস করে আসছেন।এখান থেকে শাহ সুজা চলে যান দক্ষিণে। সেখানে তারা বিশ্রাম নেন। ঐ সময় তাঁর সহযোদ্ধা সৈনিকরা হাজার ঢুলির রণবাদ্যে পুরো এলাকা আতঙ্খিত করে তোলে। ঢুলির রণবাদ্যের কারণে ঐ এলাকার নামকরণ হয়ে যায় ডুলাহাজরা।বতমানে এটি চকরিয়া থানার প্রসিদ্ধ একটি এলাকা। ১৬৬০ সালের ১৭ আগস্ট ১০ জিলহজ্ব মাস কোরবানীর ঈদ।ডুলাহাজরার দক্ষিণে একটি এলাকায় শাহ সুজা ঈদের নামাজ আদায় করেন। ঐ এলাকাটি পরবতীতে ‘ঈদগাঁ’ নামে নামকরণ হয়ে যায়। শাহ সুজা ঈদগাঁ, ঈদগড়, গজনিয়া, বড়বিল, কচ্ছপিয়া, হয়ে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে নাফনদীর তীরে পৌঁছেন।শাহ সুজা যে পথ দিয়ে নাফনদীর তীরে পৌঁছেন ঐ পথটি তাঁরই নামের স্মারক হিসেবে পরবতীতে ‘শাহসুজা সড়ক’ নামে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। ইংরেজরা চট্টগ্রাম অধিকার করলে সড়কটির আগের নাম পরিবতন করে নতুন নামকরণ করেন ‘আরাকান সড়ক’। শাহ সুজা নাফ নদীর তীরে পৌঁছে আরাকান রাজার শর্ত অনুযায়ি তাঁরই অনুগামী সৈনিকদের বিদায় জানিয়ে ১৬৬০ সালের ২৬ আগস্ট নিকট আত্মীয় ও মাত্র ২০০ জন দেহরক্ষী নিয়ে, কোন কোন সূত্র মতে ৮০ জন দেহরক্ষী নিয়ে ১৩ দিন ১৩ রাত চলার পর আরাকানের রাজধানী ম্রোহং এ উপস্থিত হন। আরাকানের রাজা সান্দা -থু-ধমা পরম আতিথেয়তার সাথে বাংলার নবাব শাহ সুজাকে গ্রহণ করেন এবং লেমব্রু নদীর তীরে বাবুডং পাহাড়ের পাদদেশে গুয়াথিক্রেক নামক স্থানের নদীর বিপরীতে বাঁশের তৈরী একটি বাড়ি শাহ সুজাকে উপহার দেন।
আরাকান রাজ প্রতিনিধি পাঠিয়ে তাদের রাজকীয় অতিথিদের বরন করে নিলেন বটে তবে প্রথমেই শর্ত দিলেন তাদেরকে সকল অস্ত্র শস্ত্র জমা দিতে হবে। রাজপ্রাসাদের অদুরে তাদের জন্য তৈরী আলাদা প্রাসাদে পরিবার পরিজন আর তার সহযাত্রীদের নিয়ে উঠলেন শাহ সুজা।স্থানীয় লোকজন বর্তমান এই গ্রামটিকে এখনো সুজা গ্রাম নামেই ডেকে থাকে।
বিশিষ্ট ইংরেজ স্থাপত্য ও ইতিহাসবিদ জন হার্ভে যিনি শাহ সুজার উপর বই লিখেছিলেন। তার লেখা থেকে জানা যায় শাহ সুজার আরাকানে আসার একটি বড় কারন ছিল পবিত্র মক্কা শারীফ যাওয়া ও সেখানেই তাঁর জীবন কাটিয়ে দেয়া। নিজস্ব সমুদ্রগামী জাহাজ বহরে রাজকীয় অতিথির শেষ ইচ্ছা পুরন করবেন বলে ইতিমধ্যে ধুর্ত আরাকান রাজ প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন।
হার্ভের মতে শাহ সুজা যখন সেই হাতী ঘোড়া বোঝাই বিশাল ধন সম্পদের পাহাড় নিয়ে আরাকান উপস্থিত হলেন তখন তা দেখে লোভী বর্মী রাজ তার সব প্রতিশ্রুতি ভুলে গেল। শুধু ধন সম্পত্তি লুট করে নেয়াই নয়, লম্পট রাজ Sanda Thudama শাহা সুজার অপরূপ সুন্দরী কন্যা গুলরুখকে দেখেই তাকে ভোগ করার জন্য উম্মাদ হয়ে ওঠে।
চরম বিশ্বাসঘাতক আরাকান রাজ এই লক্ষ্যে এগিয়ে আসলে অস্ত্র-সস্ত্রহীন শাহ সুজা ও তাঁর দলবল নিজেদের নিয়ন্ত্রন করতে ব্যার্থ হয়। যার ফলশ্রুতিতে তারা আরাকান রাজপ্রাসাদ আক্রমন করে আগুন লাগিয়ে দিতে ব্যার্থ চেষ্টা করে । প্রতি উত্তরে আরাকান রাজ তার নিরস্ত্র অতিথিদের উপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। সময় ছিল ১৬৬০ সনের ডিসেম্বর। সেদিনও আরাকানের মাটি আশ্রিতদের রক্তে ভিজে উঠেছিল।
শাহ সুজার মৃত্যুর দিন তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে কিছুটা মতভেদ আছে। কারো কারো মতে আরাকান রাজের হাতে সেদিনই শাহ সুজার মৃত্যু হয়েছিল, আবার কারো মতে রাজধানীর বাইরে ম্রহং এলাকার জঙ্গলে পরিবার পরিজন নিয়ে পালিয়ে থাকা শাহ সুজাকে ১৬৬১ সনের ৭ই ফেব্রুয়ারী হত্যা করেছিল আরাকান সৈন্যরা। শাহ সুজার তিন ছেলেকে বন্দী করে নিয়ে পরে মাথা কেটে হত্যা করা হয়েছিল মুঘল ইতিহাসের সেই নিষ্ঠুরতম দিনেই লম্পট আরাকান রাজের লালসার শিকার হয়েছিল মুঘল সুবাদারের প্রিয় কন্যা গোলাপ সুন্দরী গুলরূখ বানু (আমেনা বানু) । সেই অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্নহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল ধর্ষিতা গুলরূখ।
মুঘল সিংহাসনের প্রতি লোভের এক চরম মুল্য দিয়েছিলেন সম্রাট শাহজানের চার পুত্র।
বি.দ্র. এই লিখাটি চট্টল চিত্র থেকে সংগৃহিত।