গোলাম কবির:
মরহুমা নূরুন্নাহার খানম (১৯২৮ – ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮৪)(গাগলাজুর, মোহনগঞ্জ , নেত্রকোনা ), রত্নগর্ভা মা, রাজনীতিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, একজন রুচিশীল আধুনিক, প্রগতিশীল নারী। তিনি দুই মুক্তিযুদ্ধার মা। তিনি ছিলেন ভাটি বাংলার সুলতানা রাজিয়া।
**পরিবার: **
তাঁর স্বামী প্রয়াত ডা. আব্দুর রহমান চৌধুরী (১৯২১-১৬ জানুয়ারি ১৯৬৫) ছিলেন গাগলাজুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান । তিনি ছিলেন ভাটি বাংলার কিংবদন্তির সিংহ পুরুষ ও মহান সমাজসেবী। কতিত আছে যে, তিনি মোহনগঞ্জ থানা পরিষদ থেকে মিটিং শেষ করে মোটর বাইক এ বাড়ি ফেরার পথে শত্রুরা তাঁকে হত্যা করে।
তাঁদের তিন ছেলেরা হলেন –
১. মরহুম মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রব্বানী চৌধুরী (১৯৫০-১৩ এপ্রিল ২০১৬), বীর মুক্তিযোদ্ধা, জন নন্দিত রাজনৈতিক নেতা , গাগলাজুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান
২. মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মুকুল চৌধুরী
৩. কামাল পাশা চৌধুরী, আওয়ামীলীগ রাজনীতিক নেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে গ্রাজুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রনেতা, বর্তমানে গণ-জাগরণ মঞ্চের শীর্ষ নেতা, আর্টিস্ট ও জাতীয় “দৈনিক জাগরণ” পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক **শিক্ষা : **
কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী তাঁর ছিলনা অথচ শিল্প সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস বিষয়ে তাঁর যে জ্ঞান ছিল তা’ সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রীরও অধিক। বাংলা, সংস্কৃত ও ফার্সিতে ছিল সমান দখল। তিনি ছিলেন সময়ের তুলনায় অগ্রসরমান এক নারী।
**রাজনীতি ও সমাজ সেবা :**
ষাটের দশকে তাঁর রাজনীতিক স্বামীকে শত্রুরা হত্যা করার পর এলাকার রাজনীতির হাল ধরেন তিনি নিজেই। অন্তঃপুর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। স্বামীর আসন থেকেই নির্বাচন করে পরাজিত করেন মুসলিম লীগ প্রার্থীকে।তাঁর বিরুদ্ধেও শুরু হয় চক্রান্ত। আক্রমণ হতে থাকে জমি জমা এবং বাড়ি ঘরেও। তিনি দৃঢ়তার সাথে রুখে দাঁড়ান। একাধিকবার তাঁকে সরাসরি গুলি চালাতে হয়েছে প্রতিপক্ষের উপর। তাঁর তিন ছেলে সন্তান তখন নেহাত শিশু এবং বালক।তাদেরও লালন করেছেন একই রকম নিষ্ঠায়, একই শিক্ষা ব্রত দিয়ে। নিজ পিতৃকুলের পরম্পরায় তিনি ও ছিলেন কমিউনিষ্ট আদর্শের অনুসারী। দুর্গম হাওরে অবস্থানের কারনে পলাতক রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিরাপদ আশ্রয় ছিল তাঁর বাড়ি। মনি সিংহ, রবি নিয়োগী, রেড হান্নান সহ অনেককেই তিনি আশ্রয় দিয়েছেন নানা সময়ে এবং অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করতেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সত্যকিরণ আদিত্যের লিখায় তার উল্লেখ আছে।তিনি ছিলেন সমগ্র এলাকার দরিদ্র মানুষের পরম নির্ভরতা।
**মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান :**
তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে। তাঁর তিন ছেলের মধ্যে বড় দুই ছেলে গোলাম রব্বানী চৌধুরী ও মুকুল চৌধুরী কে তিনি নিজেই মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। ছোট ছেলে কামাল পাশা চৌধুরীর বয়স কম থাকায় মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারেননি।
**তাঁর প্রগতিশীলতা:**
তিনি সেই ষাটের দশকে একজন মুসলিম মহিলা হয়েও তাঁর প্রিয় দৌড়ের ঘোড়া ‘কাঞ্চন ‘ এর উপর সওয়ার হয়ে অথবা কখনো মোটর বাইক চালিয়ে ,কাঁধে কার্তুজের বেল্ট আর ডাবল ব্যারেল বন্দুক নিয়ে , বিস্তির্ণ হাওরের বুক চিরে দুর্বার গতিতে-বাতাসে পতাকার মত তার দীঘল কালো চুল উড়িয়ে গাগলাজুর থেকে মোহনগঞ্জ শহরে আসতেন থানা পরিষদ সভায় যোগ দিতে। এই মহিয়সী নারীর বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি ছিল গভীর ভালবাসা। তিনি এই বিষয়ে অন্যদের প্রেরণা ও ছিলেন । আরবী , ফার্সি ভাষায় ও ছিল তাঁর গভীর জ্ঞান।
তাঁদের মোহনগঞ্জের বাসা টা থানা রোডে শিয়াল জানি ব্রিজের পাশেই রাস্তার উত্তর পাশে। আশির দশকে তিনি এই বাসাতেই থাকতেন।
সম্পাদনা: গোলাম কবীর, টরন্টো, কানাডা (চন্দ্রপুর, বারহাট্টা, নেত্রকোনা ),২৯ এপ্রিল ২০১৬
তথ্য সুত্র:
১. খান মিষ্টু, বরান্তর, মোহনগঞ্জ।
২. কামাল পাশা চৌধুরী, তাঁর ছোট ছেলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রনেতা, বর্তমানে গণ-জাগরণ মঞ্চের শীর্ষ নেতা, আওয়ামীলীগ এর নেতা , আর্টিস্ট ও জাতীয় “দৈনিক জাগরণ” পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক।
৩. বিলকিস নাহার স্মৃতি, কানাডা প্রবাসী, মরহুম ডা. আব্দুর রহমান চৌধুরী সাহেবের নাতনী।
৪. আব্দুল মজিদ, গাগলাজুর, মোহনগঞ্জ। তিনি শ্যামপুর হাইস্কুলের প্রতিস্টাতা হেডমাস্টার, ময়মনসিংহ এর মাসকান্দা তে একটি স্কুল এর প্রতিস্টাতা, এবং গাগলাজুর বাজারের পাশে ভাটীবাংলা হাই স্কুল টি তিনি প্রতিষ্টা করেন। তাঁর বর্তমান বয়স আনুমানিক ৭০ বছর।