বিনোদন ডেক্স:
১৯৪৮ সালে যখন ভাষা আন্দোলন শুরু হলো, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তখন বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ আর পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা গাজীউল হক তখন সেখানে ছাত্র। তাঁদের নেতৃত্বে বগুড়ায় শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। ইবনে মিজানও ছিলেন।
ইবনে মিজানের ছোটবোন মকবুলা মনজুর, কথাসাহিত্যিক। ৫২ সালে যখন ভাষা আন্দোলনে গুলি হয়, তিনি পড়তেন টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী স্কুলে। স্কুলের গেইট ভেঙে ছাত্রীদের নিয়ে মিছিল করায় তাঁকে আর হোস্টেলে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, পরে ভারতেশ্বরী হোমসে ভর্তি হন।
ইবনে মিজানের ছোটভাই সাবেক নকশালাইট, পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল, মতিন-আলাউদ্দিন) সাধারণ সম্পাদক, কৃষক আন্দোলন নেতা, ভাসানী শিষ্য এম এম মসিউর রহমান টুঙ্কু। পার্টির দেওয়া ছদ্মনাম আজিজ মেহের।
এই বিপ্লবী পরিবারের ইবনে মিজান রাজনীতি ছেড়ে যোগ দেন চলচ্চিত্রে। ষাটের দশকে ব্লক বাস্টার হিট চলচ্চিত্র পরিচালক। তাঁদের বাবা পুলিশ অফিসার মিজানুর রহমান, সেই সূত্রে পুত্রের নাম ইবনে মিজান, কিন্তু আসলে তাঁর নাম কী? আমার জানা নেই।
কাছাকাছি সময়েই বগুড়া থেকে সুভাষ দত্ত ছুটছেন ফিল্ম শিখতে মুম্বাইতে, ত্রিশ টাকা বেতনে চাকরি নিচ্ছেন পাবলিসিটির স্টুডিওতে আর বগুড়ায় বসেই ফজলুল হক নামের এক যুবক বের করছেন তৎকালীন পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা ম্যাগাজিন ‘সিনেমা’।
ইবনে মিজান এলেন চলচ্চিত্রে, সঙ্গে আজিজ মেহেরও। মেহের ততদিনে এ জে কারদারের ‘দূর হ্যায় সুখ কা গাঁও’ সিনেমায় প্রোডাকশন ম্যানেজারি করেছেন। দুভাই মিলে বানালেন উর্দু ছবি ‘ঔর ঘম নেহি’, ১৯৬৪ সালে। নায়ক আনোয়ার হোসেন আর আজিম, সঙ্গে দুই বিদেশি নায়িকা জার্মানির ক্যালুস পিলে আর ডেনমার্কের লিলিয়েন। কর্ণফুলি পিকচার্সের সেই ছবির পোস্টার হলো, বিজ্ঞাপন হলো, কিন্তু সিনেমা রিলিজ হলো না। কেন জানি না।
তখন বাংলা সিনেমার শুরুর যুগ। বাংলা, উর্দু প্রচুর সিনেমা হচ্ছে। কিন্তু ১৯৬৫ সালে সালাহউদ্দিন ‘রূপবান’ নির্মাণ করে বাংলা চলচ্চিত্রকে বাণিজ্য-সফল করে তোলেন। রহিম, রূপবান আর তাজেলের গল্প দেখতে মানুষ দূর গ্রাম থেকে চিড়া মুড়ি নিয়ে হাজির হলো সিনেমা হলে।
রূপবানের সাফল্যে একের পর এক ’রূপবান’ নির্মিত হতে লাগলো। বনবাসে রূপবান, আবার বনবাসে রূপবান, রহিম বাদশা ও রূপবান প্রভৃতি। সবগুলোই ব্যাবসাসফল। ট্রেন্ড হলো লোককাহিনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মানের। সাত ভাই চম্পা, কমলার বনবাস, মহুয়া, কাঞ্চনমালা, বেহুলা, আলোমতি, গুনাইবিবি, অরুণ বরুণ কিরণমালা প্রভৃতি। অনেক বছর পরে বেদের মেয়ে জোৎস্না যেমন বাণিজ্য ট্রেন্ড তৈরি করেছিলো, ৬৫তে রূপবানও তেমন।
’ঔর ঘম নেহি’ ব্যর্থতার পর ইবনে মিজান আর আজিজ মেহের ভ্রাতৃদ্বয় বানালেন ‘একালের রূপকথা’, সেটাও তেমন জমলো না। ১৯৬৬ সালে ইবনে মিজান একাই বানালেন ‘আবার বনবাসে রূপবান’, এবার হিট। এমন হিট যে এরপর ইবনে মিজান একে একে নামাতে লাগলেন ফোক ফ্যান্টাসি ঘরানার প্রচুর ছবি। জরিনা সুন্দরী, জংলী মেয়ে, রাখাল বন্ধু, পাতালপুরীর রাজকন্যা, নাগিনীর প্রেম, আমির সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরী, কমলা রানীর দিঘী প্রভৃতি বানিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের ফোক ফ্যান্টাসির বিগশট হয়ে গেলেন।
ওদিকে আলেকজান্দার দ্যুমার পৃথিবীখ্যাত ক্লাসিক উপন্যাস ‘দ্য করসিকান ব্রাদার্স’ অনুবাদে, থিয়েটারে, সিনেমায় রূপ বদলে বদলে যখন বাংলায় এলো, তা হয়ে উঠলো ‘নিশান’। মধুমিতা মুভিজের প্রযোজনায় এই সিনেমা বানাতে নামলেন ইবনে মিজান। দুই যমজ ভাইয়ের বিপরীতমুখি দুই চরিত্রে একক অভিনয় করে যে অমর কীর্তি গড়লেন জাভেদ, গত প্রায় পঞ্চাশ বছরে শত শত ছবি করেও তা ম্লান করতে পারলেন না জাভেদ।
১৯৪৪ সালে পাকিস্তানের পেশোয়ারে জন্ম নেওয়া রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস কৈশোর পেরিয়েই চলে এসেছিলেন ঢাকায়, সিনেমা করবেন বলে। সঙ্গে কোরিওগ্রাফি, ভালোবাসতেন নাচতে। আগে দুয়েকটা ছবি করলেও, ’মালকা বানু’ প্রবল হিট হলেও ততোদিনে শুধু তাঁর নামটাই বদল হয়েছে, রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস নাম পরিবর্তন করে হয়েছেন জাভেদ। কিন্তু এক ‘নিশান’ বদলে দিলো তাঁর ক্যারিয়ার।
অবশ্য এর আগেই নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে বাংলাদেশকেই আপন করে নিয়েছিলেন জাভেদ। সেই দেশেই আজ তার দেহাবসান হলো। বাষট্টি বছরের চলচ্চিত্র জীবনে যার ঝুলিতে প্রচুর দর্শকপ্রিয়তা আর ভালোবাসা জুটলেও কোনো পুরস্কার, সম্মাননা বা স্বীকৃতি জুটলো না…
বি:দ্র: ‘দ্য করসিকান ব্রাদার্স’ উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন, সেবা প্রকাশনীর বই পাওয়া যায়।
তথ্যঋণ: নজরুল সৈয়দ ও বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ।