পর্ব-২
রানা চক্রবর্তী :
যদিও প্রাচীনকালে পৃথিবীর সব দেশেই যুদ্ধক্ষেত্রে পদাতিক, রথ ও অশ্ববাহিনীর ব্যবহার চালু ছিল বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়, কিন্তু তবুও তখনকার এই পরিস্থিতিতে প্রাচীন ভারতবর্ষের রাজ্যগুলিতে রণহস্তী-বাহিনী আধুনিকযুগের ট্যাঙ্কবাহিনীরই সমগোত্রীয় ছিল। আর এই হস্তীযুদ্ধ, এবং একইসাথে নৌযুদ্ধেও প্রাচীন ভারতের গঙ্গারিডি, অর্থাৎ—নিম্নবঙ্গবাসীরা যে রীতিমত পারদর্শী ছিলেন, একথার বিস্তর প্রমাণও ইতিহাসে পাওয়া যায়। এপ্রসঙ্গে গ্রিক পর্যটক ও ভূগোলবিদ মেগাস্থিনিস তাঁর বিবরণীতে লিখেছিলেন যে, গঙ্গারিডিদের কাছে প্রচুর পরিমাণে বিশালকায় রণহস্তী ছিল বলেই তখনকার কোন বিদেশী রাজা এদেশ জয় করতে পারেন নি; কারণ, তৎকালীন ভারত ও ভারতের বাইরের অন্যান্য জাতিসমূহ তখন এই অত্যধিক শক্তিশালী অসংখ্য রণহস্তীর কথা শুনেই ভয় পেতেন।
এরপরে আরেক গ্রিক ঐতিহাসিক ডিওডোরাসও বিশ্ব ইতিহাস নিয়ে লিখতে গিয়ে মেগাস্থিনিসের এই উক্তিকে সমর্থন করেছিলেন, এবং আরও সুস্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন যে, ম্যাসিডনবাসী আলেকজান্ডার প্রায় সমগ্র এশিয়া জয় করেও শুধুমাত্র গঙ্গারিডিদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে বিমুখ হয়েছিলেন। কারণ, তিনি ভারতবর্ষের অন্যান্য জাতিকে পরাজিত করে নিজের সমগ্র সৈন্যবলসহ গঙ্গাতীরে উপস্থিত হয়ে জানতে পেরেছিলেন যে, গঙ্গারিডিদের সর্বাপেক্ষা রণনিপুণ চার হাজার হাতি যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়ে তাঁর বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করছে। আর একথা শুনবার পরেই তিনি তাঁদের সঙ্গে যুদ্ধ করবার সঙ্কল্প পরিত্যাগ করেছিলেন। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসকার প্রদত্ত এই ঐতিহাসিক তথ্যকে প্রাচীন ভারতের গঙ্গারিডি জাতির প্রশংসনীয় পরাক্রমের প্রশংসাপত্র বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারে। আর তৎকালীন বিদেশী লেখকদের বর্ণনা থেকে ইতিহাসের নির্মম সত্যরূপে দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডারের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পশ্চাদপসরণ করবার এই কারণটিকে প্রধান কারণ হিসাবে ধরে নিতেই হয়।
তবে গঙ্গারিডির বর্ণনা প্রসঙ্গে ডিওডোরাস এখানেই থেমে যাননি; এরপরে তিনি আরও জানিয়েছিলেন যে, বিশাল আয়তন ও বিপুল জনসংখ্যার ভিত্তিতে দক্ষিণের দেশগুলির মধ্যে ভারতবর্ষ তখন প্রধান ছিল, প্রাচীনকালেও এই দেশ বহুসংখ্যক জাতি-দ্বারা অধ্যুষিত ছিল, আর প্রাচীন ভারতের সেসব জাতির মধ্যে ‘গঙ্গারিডি জাতি’ বৃহত্তম ছিল। তিনি প্রাচীনকালের প্রাসী ও গঙ্গারিডিকে একাধিক রাজ্য, কিন্তু একটি জাতি (the dominions of the nation of the Braisioi and the Gangaridai) হিসেবেই নিজের লেখায় উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, তখন এই যুক্তরাজ্যের রাজা ছিলেন স্নান্দ্রামেস; এবং তাঁর কাছে সবসময় যুদ্ধের জন্য ২০,০০০ অশ্বারোহী, ২,০০,০০ পদাতিক, ২,০০০ রথ ও ৪,০০০ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রণহস্তী তৈরি থাকত।
এরপরে খৃষ্টীয় ১ম শতকে কার্টিয়াস রুফাস নামক একজন রোমান ঐতিহাসিক তাঁর ‘লাইফ অফ আলেকজান্ডার’ নামক গ্রন্থে লিখেছিলেন যে, আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময়ে এ্যাগ্রামেস গঙ্গারিডি ও প্রাসী নামক দুই জাতির অধীশ্বর ছিলেন (two nations, the Gangaridai and the Pharrasii); তাঁর অধীনে ২০,০০০ অশ্বারোহী, ২,০০,০০০ পদাতিক, ২,০০০ চার ঘোড়ায় টানা রথ ও ৩,০০০ রণহস্তী ছিল। ঐতিহাসিকেরা বলেন যে, রুফাস কর্তৃক উল্লিখিত এই ‘Agrammes’ বা ‘Xandrames’ নামটি আসলে ‘উগ্রসেন’ নামের বিকৃত রূপ। আর এই শাসক আসলে উগ্রসেনের পুত্র, অর্থাৎ—মগধরাজ মহাপদ্মনন্দের পুত্র ধননন্দ ছিলেন।
তবে অন্যদিকে গ্রিক ঐতিহাসিক প্লুটার্ক কিন্তু গঙ্গারিডির রাজা ও প্রাসীর রাজা যে একই ব্যক্তি ছিলেন—একথা বলেননি; বরং তিনি—‘Kings of the Gandaritai and the Praisioi’—বলেছিলেন; আর এই উভয় রাজার সম্মিলিত সৈন্যবাহিনী নিয়ে তিনি যে তথ্য দিয়েছিলেন, সেটা এরকম ছিল—৮০,০০০ অশ্ব; ২,০০,০০০ পদাতিক; ৮,০০০ রথ; এবং ৬,০০০ রণহস্তী। সুতরাং প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের এই পর্যায়ে গঙ্গারিডি নামের একটি যুক্তরাজ্য ও জাতি (Nation), এবং আরও একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী (tribe) ও জনপদের (State) পরিচয় ইতিহাসে পাওয়া যায়।
আর রোমান ঐতিহাসিক সলিনাসের মত ছিল যে, এই জনগোষ্ঠীর কাছে তখন ১,০০০ অশ্বারোহী, ৭০০ হাতি ও ৬০,০০০ পদাতিক সৈন্য ছিল। এছাড়া সলিনাস ও প্লিনির বিবরণ থেকে একথাও জানা যায় যে, প্রাসী, অর্থাৎ—প্রাচ্য জাতির (প্রাচ্য-গঙ্গারাষ্ট্রের) রাজা তখন বেতন দিয়ে সর্বদা ৬,০০,০০০ পদাতিক, ৩০,০০০ অশ্বারোহী ও ৯,০০০ হাতি রাখতেন। ঐতিহাসিকদের মতে, এখানেও মগধসম্রাট ধননন্দের সৈন্যবাহিনীর কথাই বলা হয়েছিল, এবং এর আগে স্বতন্ত্র গঙ্গারিডি জনগোষ্ঠীয় নিজস্ব পৃথক সৈন্যবাহিনীর কথাও বলা হয়েছিল।
দুই রোমান ইতিহাসকারের প্রদত্ত এই তথ্য থেকে প্রাসীর সঙ্গে গঙ্গারিডিদের কনফেডারেশন গঠনের একটা সুস্পষ্ট তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যায়। আসলে প্রাসী, অর্থাৎ—মগধ সাম্রাজ্যকে গঙ্গারিডি যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করবার ফলে তখন নামভূমিকায় গঙ্গারিডি-জনগোষ্ঠীর সুখ্যাতি বৃদ্ধি পেয়েছিল। আর এসব ছাড়া তাম্রলিপ্ত ও কলিঙ্গের সঙ্গেও গঙ্গারিডির কনফেডারেশন গঠনের কথাও সমকালীন ইতিহাসে পাওয়া যায়।
প্রাচীনকালে বর্হিভারতে—গ্রীস, রোম, মিশর প্রভৃতি দেশে গঙ্গারিডিদের শৌর্যসম্পদের কথা সুপ্রচারিত হয়েছিল; আর এঁদের গৌরবগাথায় বিমুগ্ধ হয়েই রোমদেশীয় মহাকবি ভার্জিল খৃষ্টপূর্ব ১ম শতকে লিখেছিলেন—
“In foribus pugnam ex auro solidoque elephanto
Gangaridum faciam, Victorisque arma Quirini.”
(Virgil, Georg. III 27)
এর ইংরেজি অনুবাদ হল—
“On the doors will I represent
In solid gold and ivory …
The battle of the Gangaridae.”
আধুনিকযুগের বাঙালি কবি সরোজকুমার দত্ত এর বঙ্গানুবাদ করে লিখেছিলেন—
“আমার দুয়ার ভরি রাখিব উৎকীর্ণ করি
নিটোল সুবর্ণ আর গজদন্ত সনে …
গঙ্গারিডি রণে।”
প্রাচীনকালে ভার্জিল ছাড়াও আরও ভ্যালেরিয়াস ফ্লাক্কাস নামক আরও একজন রোমক কবি তাঁর ‘আর্গোনটিকা’ নামক কাব্যে লিখেছিলেন যে, পৌরাণিক বীর জ্যাসনের বিরুদ্ধে গঙ্গারিডিরা কৃষ্ণসাগরকূলে সৈন্য সমাবেশ করেছিলেন। আর এরপরে খৃষ্টীয় ৪র্থ-৫ম শতকে ভারতীয় মহাকবি কালিদাসও তাঁর ‘রঘুবংশ’ নামক কাব্যে এই অঞ্চলের নৌযুদ্ধনিপুণ অধিবাসীদের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
এছাড়া ‘পেরিপ্লাস’ গ্রন্থকার একজন অজ্ঞতনামা গ্রীক-নাবিক খৃষ্টীয় ১ম শতকে সরেজমিনে গঙ্গে বন্দর পরিদর্শন করে জানিয়েছিলেন যে, বৃহত্তর গঙ্গানদী যেখানে সাগরে পড়েছিল, তার নিকটবর্তী নদীতীরে অবস্থিত ‘গঙ্গে’ নামক হাট-শহরে তখন তেজপাতা, সুগন্ধি গাঙ্গেয় অঞ্জনতৈল, প্রবাল, মুক্তা, সর্বাধিক উৎকৃষ্ট গাঙ্গের মসলিন প্রভৃতি ব্যাপকভাবে বেচাকেনা চলত। এছাড়া তিনি লোকমুখে শুনেছিলেন যে, এখানে তখন একটি সোনার খনিও ছিল, এবং এই দেশে ‘ক্যালটিস’ বা ‘কলিত’ নামের একধরণের স্বর্ণমুদ্রাও প্রচলিত ছিল। সমকালীন একজন প্রত্যক্ষদর্শীর এই বর্ণনা থেকে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে গঙ্গারিডিদের একটি সম্পদশালী জাতিরূপেই দেখতে পাওয়া যায়।
গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমির মত ছিল যে, উক্ত গঙ্গে নগর তখন গঙ্গারিডিদের রাজধানী ছিল, এবং এখানেই তাঁদের রাজা বাস করতেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে—মেগাস্থিনিস, ডিওডোরাস, কার্টিয়াস, প্লুটার্ক, স্টাবো, প্লিনি, আরিয়ায়, সলিনাস প্রমুখ ইতিহাস লেখকরা তাঁদের গ্রন্থে নন্দ ও মৌর্য আমলের ভারতের কথা বর্ণনা করলেও, পেরিপ্লাস নামক গ্রন্থে ও টলেমির বিবরণে কিন্তু খৃষ্টীয় ১ম-২য় শতকের ভারতের কথা বর্ণিত হয়েছিল; ইতিহাস বলে যে, এসময়ে শুঙ্গ ও কুষাণ বংশীয়রা উত্তরভারতে রাজত্ব করতেন। এসময়ে প্রাচ্য-কলিঙ্গ-গঙ্গারাষ্ট্রের কনফেডারেশনের কোন অস্তিত্ব ছিল না, এবং অতীতের সুবৃহৎ গঙ্গারাষ্ট্রের সেই আগের ব্যাপ্তিও তখন আর ছিল না। তাই টলেমি তাঁর ম্যাপে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপগুলিকে তখন গঙ্গারিডিদের স্বতন্ত্র রাজ্য হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন, এবং সাগরদ্বীপে সঠিকভাবে গঙ্গে বন্দরের স্থান নির্দেশ করেছিলেন। এছাড়া এটাও লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, এসময়ে তিনি পৃথক পৃথকভাবে প্রধান নগর হিসাবে গঙ্গে, কলিঙ্গ, তাম্রলিপ্ত, পাটলিপুত্র প্রভৃতিকে পৃথক পৃথক রাজ্যমধ্যে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন।
যদিও প্রাচীনকালের বিদেশী লেখকদের প্রদত্ত তথ্য থেকে প্রাসী, অর্থাৎ—মগধের রাজা ধননন্দ ও চন্দ্রগুপ্তের কথা পাটলিপুত্রের অধিপতি হিসেবে সঠিকভাবে জানতে পারা যায়, এবং ধননন্দ গাঙ্গেয় যুক্তরাষ্ট্রের অধিপতি হিসেবে এঁদের লেখায় উল্লিখিত হয়েছিলেন বলে দেখা যায়, কিন্তু তবুও গঙ্গে নগরের অধিপতি, অর্থাৎ—গঙ্গারিডিদের রাজা এবং সমকালীন অন্যান্য বহু জনগোষ্ঠীর রাজাদের নাম সমকালীন ইতিহাস থেকে কিন্তু জানা যায় না। ঐতিহাসিকদের মতে, সেসময় এসব অঞ্চলে রাজতন্ত্রর থেকে দলপতি-শাসনব্যবস্থা বেশি প্রচলিত ছিল। একারণেই মহাভারত ও পুরাণগুলিতে পুণ্ড্রদের প্রতিপত্তির কথা জানা যায়; আর পুণ্ড্রবর্ধন রাজ্য যে একদা উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণে উপসাগরকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল, একথাও বুঝতে পারা যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, নিম্নগাঙ্গেয় উপত্যকায় আবহমানকাল ধরে পুণ্ড্রদের সংখ্যাধিক্য বর্তমান ছিল। যেহেতু গোষ্ঠীশাসন ব্যবস্থায় সংখ্যাধিক্যের গুরুত্ব সর্বাধিক হয়, সেহেতু এই অঞ্চলে তখন এঁদেরই প্রাধান্য ছিল। প্রাচীন গঙ্গে বন্দর তথা সাগরদ্বীপকে কেন্দ্র করে এঁরাই তখন বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে স্বতন্ত্র রাজ্য গঠন করেছিলেন, এবং এটাই বিদেশীদের কাছে গাঙ্গেয় জাতি বা গঙ্গারিডি নামে অভিহিত হয়েছিল। এরপরে তাঁরা বৃহদ্বঙ্গে বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্রের শরিক হয়েছিলেন, এবং ভারতবর্ষের বৃহত্তম জাতি গঠনে সহযোগী হয়ে উঠেছিলেন।
একারণেই কালিদাস উত্তরকালে এই পুণ্ড্র ও বঙ্গদেরকে একত্রে বঙ্গজাতি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে এর আগে, মৌর্য আমলেও পুণ্ড্রবর্ধনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকার কথা ইতিহাস থেকে জানা যায়। এরপরে সম্প্রসারিত বাংলার বঙ্গদের সঙ্গে পুণ্ড্র ও সুহ্মরা ক্রমান্বয়ে মিশে গিয়ে একদা সমগ্রভাবে বাঙালি মহাজাতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। তাই বর্তমান পৌণ্ড্র ক্ষত্রিয়রা যেমন ‘ট্রাইব অফ গঙ্গারিডি’র বংশধর, ঠিক তেমন আবার সমগ্র বাঙালি জাতি ‘নেশন অব গঙ্গারিডি’র বংশধরও বটে। কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে যেমন ‘ইন্ডিয়া’ নামের কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না, ঠিক তেমনি আবার ‘গঙ্গারিডি’ নামেরও কোন উল্লেখ দেখা যায় না। কারণ, সুদূর অতীতের কোন একসময়ে অবনমনের ফলে গঙ্গাবন্দর ও নিম্নগাঙ্গেয় উপত্যকা অঞ্চল বিদেশী বণিকদের কর্তৃক পরিত্যক্ত হওয়ায় এবং গাঙ্গেয়দের বহির্বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, স্বদেশে ও বিদেশে গাঙ্গেয়দের প্রভাব বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল, এবং কালক্রমে গঙ্গারিডি নামটিও অব্যবহার্য হয়ে পড়েছিল। তা না হলে আন্তর্জাতিক ভাষায় বৃহৎ বঙ্গের নাম হিসাবে ‘গঙ্গারিডি’ নামটি হয়ত আজও বহাল থাকত।
পরিশেষে আলোচ্য প্রসঙ্গে এখানে প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থগুলিতে স্থানবাচক ‘গঙ্গা’ ও ‘লৌহিত্য’ শব্দ দুটি নিয়ে কিছু আলোচনাও হয়ত অপ্রাসঙ্গিক বলে গণ্য হবে না। অতীতে ড. সুকুমার সেন প্রাচীন ব্যাকরণ শাস্ত্রে স্থানবাচক ‘গঙ্গা’ শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে বলেছিলেন—
“গঙ্গারিদই ছিল তাদেরই এক দল যাদের বিষয় ছিল গঙ্গা (ভূমি) অর্থাৎ গাঙ্গেয় উপত্যকা। প্রাচীন বৈয়াকরণদের উদাহরণ ‘গঙ্গায়াং ঘোষঃ’ থেকে গাঙ্গেয় ভূমি অর্থে গঙ্গা শব্দের প্রয়োগ অনুমান করা যায়। গোপালকদের গ্রাম (—অর্থাৎ—ব্রজধাম) হল ‘ঘোষ’, সাধারণত নদীতীরে অবস্থিত; সুতরাং অল্পবিস্তর যাযাবর। পতঞ্জলির একটি উদাহরণ এই প্রসঙ্গে উদ্ধারযোগ্য। ‘গমিষ্যমো যোষান্ পাস্যামঃ পয়ঃ শরিষ্যমহে পুতীকতৃণেষু’ অর্থাৎ—‘আমরা যাব ঘোষে, খাব দুধ, শোব নরম ঘাসে’। খ্রীষ্টপূর্বকালে গঙ্গার ভাটি অংশ (গাঙ্গ অনুপ) কোথাও কোথাও ‘উন্মত্তগঙ্গ’ এবং ‘লোহিতগঙ্গ’ নামে পরিচিত ছিল। যেখানে গঙ্গা বিস্তীর্ণ ও প্রচণ্ড—বিশেষ করে বর্ষায় ও শরতে—সে অঞ্চল ‘উন্মত্তগঙ্গ’, অনুমান করতে পারি। এখনকার দিনের নদীনাম ‘মাতলা’ এই নামেরই যেন প্রতিধ্বনি। বারানসীর নীচে থেকে সাগর সঙ্গম পর্যন্ত সমগ্র গাঙ্গেয় ভূমিকে পতঞ্জলির সময়ে ‘উন্মত্তগঙ্গ’ বলা অযথার্থ ছিল না। শোন, বরাকর, অজয় ও দামোদর—প্রধানত এই চার নদীই সেকালের বঙ্গভূমিতে প্রচুর লাল জল ঢেলে এসেছে; সুতরাং উন্মত্তগঙ্গের নিম্নার্ধকে যথার্থই লোহিতগঙ্গ বলা যায়।”
খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর দার্শনিক ঋষি পতঞ্জলি পাণিনি-ভাষ্যকার ও যোগশাস্ত্র-সূত্রকার হিসেবে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে খ্যাত। তাঁর রচিত পাণিনি-ব্যাকরণের ভাষ্য ‘পাতঞ্জল-মহাভাষ্য’ এবং তাঁর রচিত যোগশাস্ত্র ‘পাতঞ্জল দর্শন’ নামে ইতিহাসে অভিহিত। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, আলেকজান্ডারের ভারতে আগমনের আগে পাঞ্জাবে প্রসিদ্ধ ব্যাকরণসূত্রকার পাণিনির জন্ম হয়েছিল, এবং তিনি ধাতুপাঠ, গণপাঠ প্রভৃতি ব্যাকরণ শাস্ত্র রচনা করেছিলেন। তাঁর ব্যাকরণ ইতিহাসে ‘পাণিনি-ব্যাকরণ’ নামে খ্যাত। এই পাণিনি-পতঞ্জলির সময়ে যে অঞ্চলকে ‘লোহিতগঙ্গ’ বলা হয়েছিল, মহর্ষি বেদব্যাস তাঁর মহাভারতে সেই অঞ্চলকেই আবার ‘লৌহিত্য দেশ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। সেসময়ে শোন, বরাকর, অজয় ও দামোদর প্রচুর লাল জল যেমন পশ্চিম দিকের রাঢ় ভূমি থেকে বয়ে নিয়ে এসেছিল, ঠিক তেমনি আবার পূর্বদিকে প্রবাহিত নদীটির নামও লৌহিত্য ছিল। সুতরাং এ হিসেবে মধ্যবর্তী এই নিম্নগাঙ্গেয় এলাকাটিই তখন লোহিত্য দেশরূপে মহাভারতে বর্ণিত হয়েছিল। এর বর্ণনা নিম্নরূপ—
“বীর্যবান পাণ্ডুনন্দন বিদেহ দেশে অবস্থান করিয়াই ইন্দ্রপর্বত সন্নিহিত কিরাতদিগের সাতজন অধীশ্বরকে পরাজিত করিলেন, পরে স্বপক্ষ হইলেও সুহ্ম ও প্রসুহ্মদিগকে যুদ্ধে জয় করিয়া মগধদিগের উদ্দেশ্যে গমন করিলেন। তথায় দণ্ড, দণ্ডাধার ও অপরাপর মহীশ্বরগণকে বিজিত করিয়া তাঁহাদিগের সকলের সহিত সমবেত হইয়াই গিরিব্রজে উপনীত হইলেন, এবং জরাসন্ধনন্দন সহদেবকে সান্ত্বনাযুক্ত ও করায়ত্ব করিযা সকলকেই সঙ্গে লইয়া কর্ণের প্রতি ধাবমান হইলেন। হে ভারত! পাণ্ডবপ্রবর বৃকোদর চতুরঙ্গ বলভরে ধরণীকে যেন কম্পমান করতঃ শত্রুনাশন কর্ণের সহিত ঘোর যুদ্ধ করিলেন এবং তাঁহাকে সংগ্রামে নির্জিত ও বশীকৃত করিয়া পর্বতবাসী রাজগণকে পরাজয় করিলেন। মহারাজ! অনন্তর তিনি মৌদাগিরিস্থ অতি বলশালী রাজাকে বহু বীর্য সহকারে মহাসমরে নিহত করিলেন; পরে পুণ্ড্রাধিপতি মহাবল বাসুদেব ও কৌশিকীকচ্ছ নিবাসী রাজা মহৌজা, প্রখর পরীক্রান্ত ও বলসম্পন্ন এই দুই বীরকে সংগ্রামে বিজিত করিয়া বঙ্গরাজের প্রতি ধাবিত হইলেন এবং মহীপতি সমুদ্রসেন, চন্দ্রসেন, তাম্রলিপ্ত, কার্বটাধিপতি, সুহ্মাধিপতি ও পর্বতবাসী নরপতিগণকে জয় করিয়া সমুদয় ম্লেচ্ছদিগকেও পরাভূত করিলেন। মহাবল পবননন্দন এইরূপে বহু বিধ দেশ বিজয় ও সর্বত্র হইতে ধন সংগ্রহ করিয়া লৌহিত্য দেশে উপস্থিত হইলেন এবং সাগরতীর প্রভৃতি জলপ্রধান দেশবাসী সমস্ত ম্লেচ্ছ নরপতিদিগকে বিবিধ রত্ন ও চন্দম অগুরুবস্ত্র কম্বল মণি মুক্তা কাঞ্চন রজত বিদ্রুম প্রভৃতি মহামূল্য বস্তুজাত কর প্রদান করিতে বাধ্য করিলেন। ম্লেচ্ছাধিপেরা তৎকালে কোটি কোটি সংখ্যক সুবিপুল ধনবর্ষণ দ্বারা মহাত্মা পাণ্ডুপুত্রকে আচ্ছাদিত করিয়াছিল। ভীমপরাক্রম ভীমসেন তখন ইন্দ্রপ্রস্থে আগমন করিয়া সেই সমস্ত ধন ধর্মরাজকে অর্পণ করিলেন।” (মহাভারত, সভাপর্ব, বর্ধমান রাজবাটী—বঙ্গানুবাদ—২, পৃ- ৫৩৪)
সুতরাং এথেকে পরিষ্কারভাবেই বুঝতে পারা যায় যে, মহাভারতে উল্লিখিত ‘লৌহিত্য’ এবং পতঞ্জলির সময়ের ‘লোহিতগঙ্গ’ আর গ্রিকদের ‘গঙ্গারিদই’ আসলে অভিন্ন। মহাভারতে বলা হয়েছে যে, ভীম লৌহিত্য দেশে উপস্থিত হয়ে—‘সাগরতীর প্রভৃতি জলপ্রধান দেশবাসী সমস্ত ম্লেচ্ছ নরপতি’–দের কাছ থেকে কর আদায় করেছিলেন। অর্থাৎ—মহাভারতের এই বর্ণনায় নিম্নবঙ্গ, অর্থাৎ—সুন্দরবনের জলাভূমির বিষয়টি আরও সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, আর এসব জায়গার দলপতি বা নৃপতিদের ম্লেচ্ছ বলা হয়েছিল। সুতরাং, এ হিসেবে বাংলার সুন্দরবন অঞ্চলকে পাণ্ডব-বর্জিত দেশ বলা চলে না। ঐতিহাসিকেরা বলেন যে, উপসাগরকূলবর্তী ব্রাহ্মণবিহীন অরণ্য অঞ্চলে উপনিবিষ্ট যোদ্ধা জনগোষ্ঠীসমূহ তখন ব্রাহ্মণ্য ক্রিয়াকলাপমুক্ত ছিলেন বলেই মহাভারতে এঁদের ম্লেচ্ছ নামে অভিহিত করা হয়েছিল। পেরিপ্লাস গ্রন্থের বর্ণনায় এদেশের রপ্তানিদ্রব্যগুলির মধ্যে সুগন্ধি গাঙ্গেয় অঞ্জনতৈল, প্রবাল, মুক্তা, সর্বোৎকৃষ্ট গাঙ্গেয় মসলিন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য ছিল। এক্ষেত্রে লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, ভীমকে এদেশের ম্লেচ্ছ দলপতিদের দেওয়া উপঢৌকনগুলির সঙ্গে পেরিপ্লাসের এসব রপ্তানিদ্রব্যগুলির যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে।
তাহলে প্রাচীন ভারতের ব্যাকরণকারদের উদাহরণ থেকে স্থানবাচক গঙ্গা-শব্দের যে ব্যবহার পাওয়া যায়, সেই গঙ্গাভূমির অধিবাসীরাই যে একদা ‘গঙ্গাল’ বা ‘গঙ্গার’ নামে অভিহিত হতেন, আর গ্রিকরা এই গঙ্গার-শব্দের সঙ্গে ‘ইদই’ শব্দটি যোগ করেই যে গঙ্গারিদই শব্দটি যে সৃষ্টি করেছিলেন, এবিষয়ে কোন সংশয় দেখা যায় না। এছাড়া নিম্নবঙ্গের ‘সাগরতীর প্রভৃতি জলপ্রধান’ যেসব অঞ্চল মহাভারতে লৌহিত্য দেশরূপে বর্ণিত হয়েছিল, পতঞ্জলির সময়ে সেসব অঞ্চলকেই লোহিতগঙ্গ বলা হয়েছিল, আর পেরিপ্লাস নামক গ্রন্থে এই একই অঞ্চল ‘গঙ্গে’ নামে চিহ্নিত হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে তাম্রলিপ্তের পরে সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে উক্ত গঙ্গা-বন্দর একদা আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছিল। আসলে প্রাচীন ভারতে স্থলপথের থেকে জলপথের প্রয়োজনীয়তা বেশি হওয়ার কারণেই নিম্নবঙ্গের নাব্য এলাকাগুলি তখন উত্তরের স্থলপথ প্রধান অঞ্চলগুলির থেকে বেশি উন্নতি করতে পেরেছিল; এবং শৌর্যসম্পদের অধিকারীরূপে নিম্নবঙ্গে এক গৌরবময় যুগের সূচনাও করেছিল। এখানকার কৃষিজীবী, শ্রমজীবী ও ব্যবসায়জীবী অধিকাংশ মানুষই তখন সাহসী ও শক্তিশালী, অর্থাৎ—কিছুটা ক্ষত্রিয়ধর্মী ছিলেন। কিন্তু একইসাথে একথাও স্মরণীয় যে, আর্য প্রভাবের বাইরে থাকবার কারণে এসব অঞ্চলের অধিবাসীরা তখন ব্রাহ্মণ্য সংস্কারমুক্ত-ও ছিলেন। বস্তুতঃ প্রাচীন ভারতের ইতিহাস বলে যে, পতঞ্জলি বর্ণিত ‘লোহিতগঙ্গ’ ও ‘উন্মত্তগঙ্গ’, অর্থাৎ—সমগ্র গাঙ্গোপদ্বীপ জুড়েই এঁরা তখন নিজেদের রাজ্যবিস্তার করেছিলেন, এবং মগধ ও কলিঙ্গের সঙ্গে একটি যুক্তরাজ্য গঠনেও সক্ষম হয়েছিলেন।
লেখক: প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্বেষণ কারী ও একজন বুদ্ধিজীবী।
শব্দ ও বানান সংশোধনে: মো: মাহবুবুর রহমান খান
সম্পাদক- প্রকাশক,দৈনিক জনতার দেশ।