শিরোনাম :
বাউফলে গণকবরস্থানে চাঁদা চেয়ে হামলা, প্রশাসনের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবীর অভিযোগ। সাবেক ডিজিএফআই এর মহাপরিচালক জেনারেল আকবর এবং এস এসএফ প্রধান লে. জেনারেল মুজিবুর রহমান এখন ভারতে মোদির আশ্রয়ে। জিয়া পরিবারের চার দশকের ঠিকানা হারানোর পেছনে তৎকালীন সেনাপ্রধান মুবীন। আজ ১২ জানুয়ারি বিপ্লবী যোদ্ধা মাস্টার দা সূর্য সেন এর প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলী। ইমাম খোমেনি ও আমেরিকার গুঁটিচাল। সম্রাট বাবরের পরাজয় এবং শানে শাহ ওবায়দুল্লাহ আহরার (রহঃ)। এক যে ছিল নেতা–দেবারতী মুখোপাধ্যায়। রাজনীতির রহস্য মানব সিরাজুল আলম খান। ভোলায় ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে বন্ধুর হাতে বন্ধু খুন। গ্যাস সংকটে জ্বলছে না চুলা।  সিলিন্ডার ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি ভোক্তাগণ।  এটি ভোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা —-ক্যাব সভাপতি। 
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:২৭ পূর্বাহ্ন

নবাবী আমলে বাংলার সংস্কৃতি—একটি পর্যালোচনা’

Reporter Name / ১০০ Time View
Update : বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

–রানা চক্রবর্তী
সমগ্র মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, বখতিয়ার খলজির সময় থেকেই বাংলায় দুটি পরস্পরবিরোধী সংস্কৃতির যে স্রোত দুটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়েছিল, সেগুলি কখনও সম্মিলিত হয়ে কোন সঙ্গমের সৃষ্টি করেনি। আর দুই সংস্কৃতির এই দীর্ঘকালব্যাপী বিচ্ছিন্নতাই অবশেষে আধুনিকযুগে পৌঁছে ১৯৪৭ সালে নিজের চরম পরিণতি লাভ করেছিল। নবাবী আমলের বাংলার হিন্দু সংস্কৃতির মূল উৎস যেমন সংস্কৃত ভাষায় লেখা বিভিন্ন শাস্ত্র, দর্শন ও সাহিত্য ছিল, অন্যদিকে মুসলমান সংস্কৃতির মূল উৎস ছিল আরবি ভাষায় লেখা বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ এবং ফারসি ভাষায় লেখা বিভিন্ন কাব্য। তাই এযুগে হিন্দুদের জীবিকা অর্জন করবার জন্য ফারসি শিখতে হলেও মুসলমানদের কিন্তু সংস্কৃত শেখবার কোন প্রয়োজন হয়নি। এমনকি ধর্মের মূলতত্ত্ব জানবার জন্য যে আগ্রহ রামমোহন রায়কে তখন আরবি ও ফারসি ভাষায় সুপণ্ডিত ‘জবরদস্ত মৌলবী’তে পরিণত করেছিল, সংস্কৃত ভাষা শেখবার জন্য সেরকম আগ্রহ কিন্তু কোন মুসলমানের মধ্যে দেখা যায়নি। বরং ইসলামই সকল সত্যের আকর ও অন্যান্য সব ধর্মই মিথ্যা—এই ধারণাই তৎকালীন মুসলমান সমাজে বদ্ধমূল ছিল। আর এই ধারণা থেকে সরে আসবার চেষ্টা, সমগ্র মধ্যযুগের ভারতীয় ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে একমাত্র বাদশাহ আকবর এবং শাহজাদা দারা ছাড়া অন্য কেউই করেন নি। সুতরাং, আলোচ্য সময়েও দুই সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রকৃত কোন মিশ্র সংস্কৃতির বা ‘composite culture’–এর উদ্ভব সম্ভব হয়নি।
নবাবী আমলের ইতিহাস লক্ষ্য করলে এটাও দেখা যায় যে, খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতকের বাংলায় মুসলমানদের কোন প্রসিদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র যেমন ছিল না, তেমনি এসময়কার বাংলায় কোন খ্যাতনামা মুসলমান ধর্মতত্ত্ববিদের জন্মও হয়নি। একারণেই এযুগে জন্ম নেওয়া রামমোহন রায় নিজের অল্প বয়সে আরবি ও ফারসি ভাষা শিক্ষা করবার জন্য মুর্শিদাবাদে বা ঢাকায় যাননি, একাজের জন্য তাঁকে পাটনায় যেতে হয়েছিল। বস্তুতঃ ইতিহাস কিন্তু একথাই বলে যে, এসময়কার ভারতে মুসলমান সংস্কৃতির কেন্দ্র উত্তর ভারতে—পাটনা থেকে দিল্লি পর্যন্ত প্রসারিত অঞ্চলে ছিল। এমনকি এরপরে পাদশাহী শাসনের বিলোপ ঘটলেও বাংলার মুসলমান সমাজে কিন্তু উত্তর ভারতের ধর্মীয় প্রভাব কোনভাবেই ক্ষুন্ন হয়নি।
ঐতিহাসিকদের মতে, খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতকের ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে দিল্লির নিবাসী শাহ ওয়ালিউল্লা (১৭০৩-৬৪ খৃষ্টাব্দ) সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক ছিলেন। (Two Nations, A. C Banerjee, p: 44-52; এছাড়া ‘S. A. A. Rizvi’ প্রণীত ‘Shah Wali Allah and His Times’ গ্রন্থে তাঁকে নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যায়) অতীতে মহম্মদ ইকবাল তাঁকে ইসলামের শেষ শ্রেষ্ঠ ধর্মতত্ত্ববিদ বা ‘last great theologian of Islam’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু অতীতের একজন মুসলমান ঐতিহাসিক তাঁর প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে, ওয়ালিউল্লা ভারতীয় মুসলমানদের পক্ষে এই উপমহাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির অঙ্গীভূত হওয়াকে পছন্দ করতেন না; তাঁর ইচ্ছা ছিল যে, তাঁরা ভারতের বাইরে অবস্থিত অন্যান্য মুসলমান দেশগুলির সঙ্গে সম্বন্ধ রক্ষা করবেন, এবং ইসলাম তাঁদের প্রেরণা ও আদর্শের উৎস থাকবে।
“Waliullah did not want the Muslims to become part of the general milieu of the sub-continent; he wanted them to keep alive their relations with the rest of the Muslim world so that the springs of their inspiration and ideal might ever remain located in Islam.”
মোটকথা হল যে, মুসলমানেরা ভারতবর্ষে বাস করেও নিজেদের মনকে এই দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখবেন—এটাই ওয়ালিউল্লার একান্ত ইচ্ছা ছিল। সমকালীন বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায় যে, তাঁর ‘মাদ্রাসা-ই-রহিমীয়া’ নামক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৎকালীন ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে শিক্ষার্থীরা সমাগত হতেন, এবং তাঁদের মাধ্যমেই তাঁর শিক্ষা তখন দূরদূরান্তরে ছড়িয়ে পড়ত। সমকালে এদেশে মারাঠাদের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা ধ্বংস করবার জন্য তিনি বিদেশী আক্রমণকারী আহম্মদ শাহ আবদালিকে আমন্ত্রণ করেছিলেন; কারণ, তাঁর বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, ভারতে ‘কাফেরদের’ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলে তাতে ইসলাম বিপন্ন হয়ে পড়বে। পরবর্তীসময়ে ওহাবীরা তাঁর এই শিক্ষাকে গ্রহণ করেছিলেন, এবং তাঁর এই শিক্ষা পূর্ববাংলার ফরাজীদেরও প্রভাবিত করেছিল। এমনকী পরবর্তীকালের ইতিহাস বিখ্যাত খিলাফত আন্দোলনও অনেকাংশেই তাঁর প্রভাবেরই ফল ছিল বলেই ঐতিহাসিকেরা মনে করে থাকেন।
লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতকের বাংলায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের যেসব উদাহরণ পাওয়া যায় বা দেওয়া হয়, সেসবের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অতি সামান্য। আসলে দুটি ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় দীর্ঘকাল ধরে একজায়গায় পাশাপাশি বাস করবার ফলে ছোটখাট বিষয়ে একে অন্যের উপরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করলেও এরফলে কোন সাংস্কৃতিক রূপান্তর বা উভয় সংস্কৃতির সংমিশ্রণ কিন্তু ঘটে না। একারণেই আলোচ্য সময়ের বাংলার হিন্দুরা তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতার জন্য বিভিন্ন পীর-ফকিরকে শ্রদ্ধা করলেও তাঁদের স্পর্শ করা অন্ন কিংবা পানীয় কিন্তু গ্রহণ করতেন না। এছাড়া নবাব মীরজাফরকে তাঁর মৃত্যুশয্যায় খুব সম্ভবতঃ তাঁর বিশ্বাসভাজন নন্দকুমারের পরামর্শে দেবী কিরীটেশ্বরীর চরণামৃত পান করানো হয়েছিল বলে যে প্রবাদ বা লোককথা এখনো প্রচলিত রয়েছে,—যদি এই ঘটনা সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে এটিকে আসলে একজন কুষ্ঠরোগগ্রস্ত মৃত্যুপথযাত্রীর যে কোন উপায়ে জীবিত থাকবার জন্য শেষ প্রচেষ্টা বলেই গণ্য করা যেতে পারে, কিন্তু এই ঘটনা দিয়ে হিন্দুধর্মের প্রতি তাঁর অনুরাগ কোনভাবেই প্রমাণিত হয় না। আর এসময়ে হিন্দুরা যেমন মহরমের শোভাযাত্রায় যোগ দিতেন, এবং অন্যদিকে মুসলমানেরা হোলি খেলতেন বলে জানা যায়, সেসবকে সাধারণ মানুষের আমোদ-উৎসবে যোগ দেওয়ার স্বাভাবিক প্রকৃতি বলেই গণ্য করা যেতে পারে। কিন্তু তবুও এসময়েই আবার ‘আমীর হামজা’ এবং ‘ইউসুফ জোলেখা’–র কবি গরীবউল্লা কবিগানের আসরে সমবেত সব হিন্দু এবং মুসলমানের জন্য আল্লাহর কাছে ‘দোয়া’ প্রার্থনা করেছিলেন বলে যে তথ্য পাওয়া যায়, এক্ষেত্রে বলা চলে যে, আজও বাংলার গ্রামে যখন গানের আসর বসে তখন সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষেরা সেখানে সমবেত হন, এবং কবিরা সাধারণ রীতি অনুসারেই সেই আসরে সকলের জন্য দৈব কৃপা প্রার্থনা করে থাকেন।
তবে আলোচ্যযুগের ইতিহাসে হিন্দুদের ধর্মবিশ্বাসে, এবং বিবাহ ইত্যাদি সামাজিক ব্যাপারে, আইনে, সাহিত্যে ও দর্শনে মুসলমানদের কোন ধরণের প্রভাব কিন্তু লক্ষ্য করা যায় না। একইসাথে এটাও লক্ষ্য করবার বিষয় যে, এসময়ে জাতিভেদহীন মুসলমান সমাজের প্রভাবে হিন্দুদের জাতিভেদ প্রথা তো ভেঙে পড়েই নি, বরং আগের থেকেও অনেক বেশি কঠোর হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে সমকালীন মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাস, সমাজব্যবস্থা, আইন প্রভৃতিও হিন্দুদের প্রভাবে পরিবর্তিত হয়নি বলেই ইতিহাসে দেখতে পাওয়া যায়।
আসলে এযুগে হিন্দু ও ইসলাম—কোন ধর্মই একে অপরকে গ্রাস করতে না পেরে উভয়ে উভয়ের থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছিল। একারণেই এযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ভারতচন্দ্র তাঁর লেখায় ‘যাবনী মিশাল’ ভাষা ব্যবহার করলেও যবনের স্পর্শ করা অন্ন বা জল কিন্তু কখনই গ্রহণ করেননি। এমনকি নিজের কাব্যে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে মানসিংহের যে কাল্পনিক কথোপকথন তিনি রচনা করেছিলেন, তাতে সমসাময়িক শিক্ষিত হিন্দুদের আশঙ্কাই ব্যক্ত হয়েছিল বলে লক্ষ্য করা যায়। এজন্যই তাঁর কাব্যে হিন্দুদের ‘আখেরে’ কি হবে, এই দুশ্চিন্তায় পীড়িত বাদশাহ তাঁদের কলমা পড়াবার ‘বাসনা’ ব্যক্ত করেছিলেন বলে দেখা যায়। যদিও নবাবী আমলের বাংলার ইতিহাসে এধরণের বাসনা পূরণের কোন প্রমাণিত ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না, কিন্তু তবুও এসময়কার হিন্দুদের মনে যে পূর্ববর্তীকালের বিভীষিকার ছায়া লুপ্ত হয়ে যায়নি—একথা এই কবি স্পষ্টভাবেই নিজের কাব্যে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বলে লক্ষ্য করা যায়। প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, অতীতে অধ্যাপক সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘প্রাক-পলাশী বাংলা’ নামক গ্রন্থের ৮৯ ও ১৬২ নং পৃষ্ঠায় এবং তাঁর সমকালের কিছু সাময়িক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধে জানিয়েছিলেন যে—
“মুর্শিদকুলি খাঁ মুর্শিদাবাদের আশে পাশের হিন্দু মন্দির ভেঙ্গে কাটোয়ার নিজের সমাধি ও মসজিদ বানিয়েছিলেন, এই অভিযোগ সম্পূর্ণ সত্যি নয়। এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত অফিসার, মুরাদ ফরাস কিছ বাড়াবাড়ি করেছিলেন বলে মনে হয়।”
কিন্তু আজও এবিষয়ে যে প্রশ্ন দুটি অমীমাংসিত থেকে গিয়েছে, সেগুলি হল—
(১) মুরাদ ফরাসকে ঠিক কি কাজের ভার দেওয়া হয়েছিল? এবং
(২) তৎকালীন বাংলার রাজধানীর সংলগ্ন অঞ্চলে তাঁর এধরণের ‘বাড়াবাড়ি’ কি ‘ব্যগতভাবে খুবই উদার প্রকৃতির মানুষ’ যে নবাব ছিলেন, তাঁর দৃষ্টিকে কখনো আকর্ষণ করেনি?
বলাই বাহুল্য যে, এসব প্রশ্নের উত্তর আজও অধরাই থেকে গিয়েছে।
যাই হোক, আসলে এযুগের দ্বিধাবিভক্ত শিক্ষা-ব্যবস্থাই বাংলার দ্বিধাবিভক্ত সংস্কৃতির উৎস ছিল। এসময়ে টোল ও চতুষ্পাঠী হিন্দুদের শিক্ষার কেন্দ্র ছিল, এবং এগুলিতে শিক্ষার মাধ্যম ছিল সংস্কৃত। আর এসময়কার হিন্দুদের শিক্ষার প্রধান বিষয় ছিল—ব্যাকরণ, কাব্য, স্মৃতি এবং ন্যায়। বস্তুতঃ এযুগে হিন্দুদের ব্যবহারিক প্রয়োজনে স্মৃতির খুব কদর ছিল; কারণ, এসময়ের হিন্দুরা নিজেদের দশকর্ম বিধানের জন্য প্রায়শঃই স্মৃতিশাস্ত্রের পণ্ডিতদের শরণাপন্ন হতেন বলে জানা যায়। আর এই স্মৃতির ব্যাখ্যার মাধ্যমেই ব্রাহ্মণরা তৎকালীন হিন্দু সমাজকে শাসন করতেন। এছাড়া এযুগের হিন্দুদের অলঙ্কার, ছন্দ, বেদান্ত, জ্যোতিষ প্রভৃতি শাস্ত্রও পড়ানো হত।
তবে বাংলায় বৈদিক সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত কিন্তু রামমোহন রায়ের হাত দিয়েই ঘটেছিল। কারণ, পরবর্তীসময়ে এপ্রসঙ্গে খৃষ্টীয় ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—
“বঙ্গদেশে বেদের লোপই হইয়া গিয়াছে। টোলে টোলে ন্যায় শাস্ত্র পড়া হয়; অনেক ন্যায়বাগীশ স্মার্তবাগীশ সেখান হইতে বাহির হন; কিন্তু সেখানে বেদের নাম গন্ধ কিছুই নাই। ব্রাহ্মণের ধর্ম যে বেদ অধ্যয়ন-অধ্যাপনা, তাহা এদেশ হইতে একেবারে উঠিয়া গিয়াছে; কেবল বেদ-বিরহিত নামমাত্র উপবীতধারী ব্রাহ্মণ সকল রহিয়া গিয়াছেন। দুই একজন বিজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ভিন্ন, কেহ তাঁহাদের নিত্যকর্ম সন্ধ্যা-বন্দনার অর্থ পর্যন্ত জানেন না।” (আত্মজীবনী, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী সম্পাদিত, পৃ: ৬৬-৬৭)
সুতরাং এথেকে বুঝতে পারা যায় যে, খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতকের বাংলায় যদি বেদ অধ্যয়ন-অধ্যাপনা প্রচলিত থাকত, তাহলে দেবেন্দ্রনাথ হয়ত তাঁর যৌবনকালে এবিষয়ে এধরণের দুঃখপ্রকাশ করতেন না।
লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, অতীতের বিভিন্ন সংস্কৃত কাব্যে রাজশক্তি এবং ব্রাহ্মণ্যশক্তিকে পরস্পরের উপরে নির্ভরশীল যুগ্মশক্তিরূপে বর্ণনা করে বলা হয়েছিল—

“ক্ষাত্রং দ্বিজত্বঞ্চ পরস্পরার্থম্।”

অর্থাৎ—রাজা ব্রাহ্মণকে প্রতিপালন করবেন, এবং ব্রাহ্মণ তাঁকে সমাজশাসনের কাজে সাহায্য করবেন। কিন্তু নবাবী আমলের মুসলমান শাসনকালে যদিও ব্রাহ্মণদের পক্ষে এই রাজানুগ্রহ লাভ করা সম্ভব হয়নি, কিন্তু তবুও তৎকালীন বিত্তশালী হিন্দু জমিদারেরা এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, এসময়কার পশ্চিম বাংলায় মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র এবং পূর্ব বাংলায় রাজা রাজবল্লভ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের এবং সংস্কৃত শিক্ষার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এছাড়া বর্ধমানের রাজা কীর্তিচাঁদ এবং তিলকচাঁদ, বিষ্ণুপুরের মল্ল বংশীয় রাজা গোপাল সিংহ ও চৈতন্য সিংহ, এবং নাটোরের রানী ভবানীর কাছেও ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা যথেষ্ট আনুকূল্য লাভ করেছিলেন বলে জানা যায়।
এযুগে গঙ্গার পূর্বকূলে অবস্থিত কৃষ্ণচন্দ্রের নদীয়া, ‘বারাণসী সমতুল’ গঙ্গার পশ্চিমকূলে অবস্থিত বর্ধমান, এবং পূর্ব বাংলায় রাজবল্লভের রাজনগর বা ঢাকা—হিন্দুদের সংস্কৃতচর্চার প্রধান কেন্দ্র ছিল। এপ্রসঙ্গে রামপ্রসাদ সেনের লেখনী থেকে জানা যায় যে, তখন বর্ধমানে সংস্কৃত অধ্যয়ন করবার জন্য দ্রাবিড়, উৎকল, মিথিলা ও কাশী থেকেও ছাত্রদের সমাগম ঘটত। তাছাড়া ১৮১৮ সালে একজন খৃষ্টান মিশনারির বিবরণেও এযুগের সংস্কৃত শিক্ষার কেন্দ্ররূপে গঙ্গার পূর্বকূলে অবস্থিত ভাটপাড়া, কুমারহট্ট, জয়নগর ও মজিলপুর এবং গঙ্গার পশ্চিমকূলে অবস্থিত বাঁশবেড়িয়া, ত্রিবেণী, গোন্দলপাড়া, ভদ্রেশ্বর, বালী ও আন্দুল—এই ক’টি জায়গার উল্লেখ পাওয়া যায়।
আর খুব সম্ভবতঃ একারণেই ১৮২৩ সালে রামমোহন রায় তৎকালীন বড়লাট লর্ড আমহার্স্টকে একটি পত্রে লিখেছিলেন যে, গতানুগতিক প্রথায় ব্যাকরণ, বেদান্ত, ন্যায় প্রভৃতি পড়ে বাঙালি হিন্দুরা শুধু ‘কাল্পনিক পাণ্ডিত্য’ বা ‘imaginary learning’–ই অর্জন করতে পারবেন, কিন্তু গণিত ও বিজ্ঞান প্রভৃতি প্রয়োজনীয় বিদ্যা তাঁরা কখনোই আয়ত্ত করতে পারবেন না।
“… nо improvement can be expected from inducing young men to consume a dozen of years of the most valuable period of their lives in acquiring the niceties of Sanskrit grammar. Neither can much improvement arise from speculations which are the themes suggested by Vedanta … The student of the Nyaya Shastra cannot be said to have improved his mind after he has learned from it how many ideal classes the objects in the universe are divided into.”
রামমোহনের আগে খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতকে এমনকথা অন্য কেউই বলেন নি, এবং কারো পক্ষে বলা সম্ভবও ছিল না; কারণ, এদেশে সংস্কৃত ভাষার মাধ্যমে গণিত ও বিজ্ঞান চর্চা বহুকাল আগেই লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এমনকি রামমোহন নিজে পর্যন্ত আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় উচ্চশিক্ষা লাভ করবার পরেই ইংরেজি ভাষা শিখেছিলেন।
যদিও এযুগের হিন্দু মহিলাদের মধ্যে শিক্ষার প্রচলন অত্যন্ত সীমিত ছিল বলেই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কিন্তু তবুও এসময়কার কয়েকজন উচ্চশিক্ষিতা মহিলা সম্বন্ধে কিছু বিবরণও আবার ইতিহাসে পাওয়া যায়। যেমন—এই নবাবী আমলেই রাঢ়দেশের কুলীন বাল্যবিধবা ব্যাহ্মণকন্যা হটী বিদ্যালঙ্কার ব্যাকরণ, কাব্য, স্মৃতি ও নব্যন্যায়ে পারদর্শিতা অর্জন করে কাশীতে একটি চতুষ্পাঠী স্থাপন করেছিলেন। ১৮১০ সালে বৃদ্ধ বয়সে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। অন্যদিকে সমকালীন মহিলা কবি আনন্দময়ীর প্রতিভা শুধুমাত্র কাব্যের বৃত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বস্তুতঃ রাজা রাজবল্লভ বৈদ্যদের যজ্ঞোপবীত ধারণ উপলক্ষ্যে নবাবী আমলে যে বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠান করেছিলেন, অথর্ববেদের ব্যবস্থানুসারে আনন্দময়ীই এর বেদি তৈরি করে দিয়েছিলেন। এছাড়া এযুগেই অব্রাহ্মণ বংশীয়া রূপমঞ্জরী ব্যাকরণ, সাহিত্য, আয়ুর্বেদ ও অন্যান্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন, এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে অসামান্য পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন বলে জানা যায়। তিনি নবাবী আমলের বাংলার ইতিহাসে হটু বিদ্যালঙ্কার নামে পরিচিতা।
আলোচ্যসময়ে বাহ্মণদের সংস্কৃত অধ্যয়ন করবার মতোই মুসলমানেরা শুধু আরবি ও ফারসি পড়তেন বলে জানা যায়, এবং ইসলামী শাস্ত্রে পান্ডিত্য অর্জনের উপরেই এযুগে তাঁদের খ্যাতি অনেকটাই নির্ভর করত বলে সমকালীন ইতিহাসে দেখা যায়। এছাড়া তাঁদের মধ্যে অনেকে তখন চিকিৎসাবিদ্যাতেও পারদর্শিতা অর্জন করতেন বলেও নবাবদের কৃপাধন্য অনেক মুসলমান পণ্ডিতের নাম সমসাময়িক মুসলমান লেখকদের গ্রন্থে পাওয়া যায়।
যদিও সংস্কৃত ছাড়া সমকালীন হিন্দুদের মধ্যে অনেকে ব্যক্তিগত বিদ্যার প্রসারের জন্য, অথবা সরকারি চাকরির লোভে ফারসি পড়তেন বলে ইতিহাসে তথ্য পাওয়া যায়, কিন্তু এযুগে কোন মুসলমান সংস্কৃত পড়েছিলেন বলে কিন্তু ইতিহাস থেকে জানা যায় না।
এসময়ে হিন্দু ও মুসলমান ছাত্রদের প্রাথমিকশিক্ষা গ্রামের পাঠশালায় ও মক্তবে সম্পন্ন হত। আর এযুগে যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আরবি, ফারসি ও বাংলা শেখানো হত, সেটার নাম ছিল ‘তোলবাখানা’। আলোচ্যসময়ে চিঠিপত্র ও সহজ বই পড়া, চিঠি লেখা এবং দৈনন্দিন জীবনের পক্ষে প্রয়োজনীয় অঙ্ক কষাই প্রাথমিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল। আর এযুগে শুভঙ্করের ছড়া কণ্ঠস্থ করলে মুখে মুখে অঙ্ক করবার সুবিধা পাওয়া যেত।
অতীতে রবীন্দ্রনাথের জীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘রামমোহন ও তৎকালীন সমাজ ও সাহিত্য’ নামক গ্রন্থের ২৪নং পৃষ্ঠায় বলেছিলেন যে, খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতকে কলকাতা নিতান্তই ‘ভুঁইফোড়’ বা ‘upstart’ (শহর) ছিল, এর পিছনে তখন কোন ঐতিহ্য ছিল না। বস্তুতঃ কলকাতায় কোন ধরণের ‘সাংস্কৃতিক tradition’ গড়ে উঠতে বেশ সময় লেগেছিল। অন্যদিকে ইতিহাসও তাঁর এই বক্তব্যকে সমর্থন করে; কারণ, ইতিহাস বলে যে, ১৬৯০ থেকে ১৭৬৫ সাল পর্যন্ত প্রায় আট দশক ধরে কলকাতা শুধু একটি বিদেশী জাতির বাণিজ্যকেন্দ্রই ছিল। এখানে তখন দেশীয় মানুষদের মধ্যে যাঁরা জ্ঞানী-গুণী ছিলেন, তাঁরা আসতেন না; বরং যাঁরা সেযুগের গ্রাম্য সমাজের বন্ধন ছিন্ন করে ভাগ্যান্বেষী হয়ে অজানা পরিবেশে বাস করবার জন্য সাহস সঞ্চয় করতে পারতেন—তাঁরাই তখন কলকাতার বাসিন্দা হতেন। ফলে ‘স্বভাব-ধূর্ত ব্রিটিশ বেনিয়া’ এবং অর্থলোভী ছিন্নমূল বাঙালিরা তখন কলকাতার নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারবেন, এমন কোন সম্ভাবনাও ছিল না। কিন্তু এরপরেই বেনিয়ার রাজদণ্ড গ্রহণ করবার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর স্বভাব বদলে গিয়েছিল, এবং সেযুগের শাসন ও শোষণের বাইরে যে সংস্কৃতির জগৎ ছিল—সেদিকেও তাঁদের দৃষ্টি প্রসারিত হয়েছিল। তারপরে একসময়ে বেনিয়ার শাসনকে সংযত করবার জন্য কলকাতায় সুপ্রীম কোর্ট স্থাপিত হয়েছিল, এবং স্যার উইলিয়ম জোনস (Sir William Jones) এর অন্যতম বিচারক নিযুক্ত হয়েছিলেন। আর এভাবেই ভারতের রাজনৈতিক শক্তির নতুন কেন্দ্র কলকাতা তখন একটি নতুন সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। অন্যদিকে দিল্লি, লখনৌ, ঢাকা, মুর্শিদাবাদ মোঘলযুগের অতীত স্মৃতি সম্বল করে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে শুরু করেছিল। ফলে নবাবী আমলের ‘ভুঁইফোড়’ শহর কলকাতাই শেষপর্যন্ত ভারতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। আর তখন এই মানসিক বিপ্লবের সূচনা মুদ্রাযন্ত্র প্রবর্তনের ফলে ঘটেছিল। এরফলে যেসব মানুষরা এতকাল ধরে অন্ধের মত অন্যের কথা শুনে চলছিলেন, তাঁরা তখন পাঁচরকমের বই পড়ে পাঁচজনের কথা বুঝতে শিখেছিলেন। আরো ভালো করে বললে, এরফলে জ্ঞানের ভাণ্ডার পণ্ডিতের পর্ণকুটিরে লুকিয়ে না থেকে হাটে বাজারে জনতার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ইতিহাস বলে যে, বিদেশীরাই ভারতে প্রথম মুদ্রাযন্ত্র নিয়ে এসেছিলেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, ১৫৫৬ সালে গোয়ায় পর্তুগীজরা সর্বপ্রথম মুদ্রাযন্ত্র স্থাপন করেছিলেন। আর এরপরে খৃষ্টীয় ষোড়শ শতকের শেষের দিকে মালাবারে তামিল ভাষায় খৃষ্টধর্ম সংক্রান্ত বই ছাপা হয়েছিল। সমকালীন প্রবল পরাক্রান্ত মোঘল সম্রাটরা বা প্রাদেশিক সুবেদারেরা তখন এসব সামান্য ব্যাপারের গূঢ় অর্থ নিয়ে কোন ধরণের চিন্তা করেননি। তারপরে ১৭৭২ সালে মাদ্রাজে মুদ্রাযন্ত্র স্থাপিত হয়েছিল, এবং খুব সম্ভবতঃ এর ছ’বছর পরে ১৭৭৮ সালে হুগলিতে মুদ্রাযন্ত্র স্থাপিত হয়েছিল ও সেখানেই প্রথম হ্যালহেডের (Halhed) বাংলা ব্যাকরণ ছাপা হয়েছিল। পরবর্তীসময়ে কলকাতায় সরকারি মুদ্রাযন্ত্র স্থাপিত হয়েছিল, এবং কোম্পানির তিনজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী দ্বারা ইংরেজিতে লেখা আইনের বঙ্গানুবাদ করানো ও ছাপানো হয়েছিল। এরপরে ১৭৮৫ সালে ‘Regulations for the Administration of Justice in the Courts of Dewanec Adalat’ নামক আইনের অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, এবং সমকালে হেস্টিংসের নির্দেশে জোনাথন ডাকান (Jonathan Duncan) তৎকালীন কলকাতার সুপ্রীম কোর্ট ও সদর দেওয়ানি আদালতের প্রধান বিচারপতি স্যার এলিজা ইম্পে (Sir Elijah Impey) কর্তৃক সঙ্কলিত সংহিতার (Code) বঙ্গানুবাদ করেছিলেন। একারণেই ঐতিহাসিকেরা বলেন যে, আধুনিক বাংলা গদ্যের ক্রমবিবর্তনে তৎকালীন ইংরেজ সরকারি কর্মচারীদের অবদান ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, তাঁদের এসব অনুবাদে সাহিত্যরস না থাকলেও সরলতা কিন্তু ছিল। একটি উদাহরণ নিম্নরূপ—
“সদর দেওয়ানি আদালতে যদি কোন আপিলের বিষয়তে এমত জানা যায় যে মফঃস্বল আদালতে সে বিষয়ের সামুদায়িক বিচার হয় নাহি কিম্বা আরও কোন কারণ জন্য সদর দেওয়ানি আদালতে যদ্যপি উচিত বুঝেন তবে নূতন সাক্ষী যে আবশ্যক হয় তাহা লইয়া আপিলের বিচার ও নিষ্পত্তি করিবেন।”
যাই হোক, এরপরে রামরাম বসুর ‘প্রতাপাদিত্য চরিত’ প্রকাশিত হওয়ার ফলে বাংলাগদ্য শুধুমাত্র কাজের ভাষা না হয়ে থেকে সাহিত্যের ভাষারূপেও বিকশিত হয়েছিল।
স্যার উইলিয়ম জোনস ভারতের প্রাচীন দর্শন ও সাহিত্য প্রচারে অগ্রণী হয়েছিলেন। তিনি ১৭৮৪ সালে কলকাতায় ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’ স্থাপন করেছিলেন। সমকালে ওয়ারেন হেস্টিংসও এই গুণীজনসভার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর আনুকূল্যেই গীতার প্রথম ইংরেজি অনুবাদ যেমন প্রকাশিত হয়েছিল, ঠিক তেমনি আবার এদেশের মুসলমানদের প্রাচীন ভাষা শিক্ষাদানের জন্য কলকাতা মাদ্রাসাও তিনিই স্থাপন করেছিলেন। এছাড়া তৎকালীন বেনিয়া সরকারের কয়েকজন কর্মচারী হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রাচীন সংস্কৃতি ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে তখন জগৎসমক্ষে তুলে ধরেছিলেন বলেও ইতিহাস থেকে জানা যায়। আর এসব থেকেই বোঝা যায় যে, শাসন ও শোষণের বাইরেও ইংরেজদের দৃষ্টি তখন বহুদূরে প্রসারিত হয়েছিল। লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, এর আগে বহু শতাব্দীব্যাপী মুসলমান শাসনকালে, হাতে গোণা দু’-একজন বাদে কেউই কিন্তু ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পুনরুদ্ধার করবার জন্য কোন ধরণের উল্লেখযোগ্য চেষ্টা করেননি। বস্তুতঃ জোনস এবিষয়ে কয়েক বছরের মধ্যেই যে কাজ করেছিলেন, তা এর আগে ছ’শো বছরের মধ্যে কোন মুসলমান পণ্ডিত করবার কথা চিন্তাও করেননি। আর একারণেই অতীতের একজন আমেরিকান ঐতিহাসিক—‘David Koff’ তাঁর ‘British Orientalism and the Bengal Renaissance’ নামক গ্রন্থে যেটাকে ‘British Orientalism’ বলে অভিহিত করেছিলেন, সেটার ফল সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে পরবর্তীসময়ে নীরদচন্দ্র চৌধুরী বলেছিলেন—
“ভারতের অতীতকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ইংরেজেরা যা’ করেছিল তা’ কোন ভারতীয় করতে পারত না। তাদের কাজের ফলে হিন্দুদের কল্পনা উদ্দীপিত হয়েছিল, তারা নিজেদের ঐতিহ্য সম্বন্ধে সচেতন হয়েছিল।”
আর এই সচেতনতার ফলই এরপরে ঊনবিংশ শতকে বাঙালি হিন্দুর নবজাগরণ বা ‘Renaissance’–এ তাঁদের ধর্মচিন্তায়, সমাজ সংস্কারে, সাহিত্যে ও রাজনৈতিক কর্মে তাঁদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশের মাধ্যমে লক্ষ্য করা গিয়েছিল। কিন্তু সমকালে বাঙালি মুসলমানরা নিজেদের মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার আবেষ্টনী অতিক্রম করতে পারেননি।
লেখক পরিচিতি: রানা চক্রবর্তী একজন প্রাচীন ইতিহাস বিশারদ ও গবেষক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category