গুলশান আবাসিক এলাকার সকল ফুটপাত এখন বিএনপির দখলে। পজিশন বিক্রির মাধ্যমে বছরে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।সিটি কর্পোরেশনের নীরব ভূমিকা।
Reporter Name
/ ১৬৪
Time View
Update :
সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০২৫
Share
মো: মাহবুবুর রহমান খানঃ
রাজধানীর গুলশান -২ নম্বর সড়ক যা একসময় পরিচ্ছন্ন ও শান্ত অভিজাত সড়ক হিসেবে পরিচিত ছিল, কালের বিবর্তনে এখন সেটি রূপ নিয়েছে অবৈধ ব্যবসা ও পার্কিংয়ের স্বর্গরাজ্যে। প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে চলছে বিভিন্ন দোকানপাট, ভাতের হোটেল এমনকি গ্যারেজ। সড়কের দুইপাশে সারি সারি গাড়ি বেশির ভাগই ইউনাইটেড হাসপাতাল সহ আশপাশের স্কুল এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকের।জানা গেছে, এক শ্রেণীর অসাধু পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় চলছে ফুটপাত ও সড়ক ভাড়া দেওয়ার রমরমা ব্যবসা-বাণিজ্য। তবে কার পকেটে এ টাকা যায় তা নিয়ে কেউ মুখ খুলতে নারাজ।গুলশান- ২ এর স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ৭৫ নম্বর সড়কের পুরোটাই এখন স্থানীয় ইউনাইটেড হাসপাতালের নিরাপদ পার্কিং। এছাড়া রয়েছে স্থানীয় স্কুলের শিক্ষকদের গাড়ি, ছাত্র-ছাত্রী আনা নেওয়ার জন্য গাড়ি, রিক্সা ও বিভিন্ন কোম্পানির গাড়ি। গাড়ি পার্কিংয়ের এ প্রবণতা ৮৪ নম্বর রোড ছাড়িয়ে ৭৯ নম্বর রোড পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এ গাড়ি পার্কিং কে কেন্দ্র করে সড়ক সহ চারপাশের ফুটপাত হকারদের দখলে চলে গেছে। সড়কে ফুটপাতে গড়ে উঠেছে অন্তত ছয়টি ভাতের হোটেল, দুইটি খিচুড়ির হোটেল, চায়ের দোকান, পিটা পুলির ভ্রাম্যমাণ দোকান, ফলের দোকান, গাড়ি সারানোর গ্যারেজ, এমনকি ভাঙ্গারি দোকানের দেখা মিলেছে সেখানে। এ ছাড়া বেশ কিছু জায়গা ময়লা আবর্জনার ডাস্টবিন ও খোলা টয়লেটে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে পুরো ফুটপাত চলাচলের অযোগ্য হয়ে গেছে।
হাঁটার অযোগ্য ফুটপাত ও রাস্তায় সারি সারি গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে অভিজাত ওই এলাকায় সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে যানজট। ফুটপাতের মাঝখানে রাখা গাড়িগুলোর ১৫ /১৬ জন চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,তারা সবাই ইউনাইটেড হাসপাতালে এসেছেন। কোন গাড়ি হাসপাতালে চিকিৎসকদের, আবার রোগী বা তাদের আত্মীয় স্বজনদের, কোনটি আবার ৭৫ নম্বর রোডের স্কুলের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের। অধিকাংশ চালক জানান, হাসপাতালে গাড়ি পার্কিং করার জায়গা নেই তাই তারা রাস্তার মাঝখানেই গাড়ি রাখেন। তিন ঘন্টা গাড়ি রাখার জন্য গুনতে হয় ৮০ টাকা করে। এরপর প্রতি ঘন্টায় ৩০ টাকা করে দিতে হয়। গাড়ি চালকরা আরো জানান, সড়কের গাড়ি রাখলে আমাদের লস হয় কিন্তু হাসপাতালে জায়গা হচ্ছে না বলে আমাদের এখানে গাড়ি রাখতে হচ্ছে টাকার বিনিময়ে। এ ব্যাপারে তারা আর কোন কথা বলতে চাননি। ছাত্র -ছাত্রীদের অভিভাবকদের এক ড্রাইভার বলেন, স্কুলে বাচ্চা নিয়ে আসতে হয় তাদের গাড়ি পার্কিং করার জায়গা নেই তাই বাধ্য হয়ে এখানে গাড়ি রাখতে হচ্ছে।ফুটপাতে গড়ে ওঠা ভ্রাম্যমাণ দোকানের হকাররা বলেন, তারা প্রথমে এককালীন কিছু অর্থ দিয়ে সেখানে ব্যবসার শুরু করেছেন। আগে দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়া দিলেও বেশকিছু ফুটপাতকে পজিশন হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব দোকান থেকে মাসিক ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। গুরুত্ব ভেদে পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকায় এক একটি পজিশন বিক্রি হচ্ছে। দুর্বল দোকানদারদের তুলে দিয়ে দখল দ্বারা মোটা অংকের টাকায় নতুন করে পজিশন বিক্রি করছে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী মহল।তারা রাজনৈতিক নেতা,প্রতিবাদের কোন ভাষা নেই।জানা গেছে, ভাতের দোকান, চায়ের দোকান ও ফলের দোকান প্রতি এককালীন৫ থেকে ১০ লাখ টাকা দিতে হচ্ছে। প্রতিটি মুদি দোকান থেকে মাসিক ভাড়া হিসেবে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় কিছু বিএনপি নেতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভাতের হোটেলের ব্যবসায়ী জানান, আগে টাকা নিতো যুবলীগ এখন টাকা নিচ্ছে স্থানীয় যুবদল নেতারা।প্রতি সপ্তাহে দুই হাজার থেকে টাকা আড়াই হাজার টাকা করে মাথা পিছু প্রতিটি দোকানের জন্য দিতে হচ্ছে। এখানে বসার জন্য বহুবার এককালীন টাকা দিতে হয়েছে এরপরও শান্তি নেই। সিটি কর্পোরেশনের লোক জন এসে দুইবার উচ্ছেদ করে গেছে। ৮৪ নম্বর রোডের চা ব্যবসায়ী ফরিদা বেগম বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মিদের জানান, শুনেছি এখানে গুলশান সোসাইটি ও সিটি কর্পোরেশন মিলে হকারদের ব্যবসার জন্য স্থায়ী কার্ড করে দেবেন। গরিব মানুষ আমরা, খাবটা কি? এ জন্য তাদের সকল শর্ত মেনে নিয়েই দোকান চালাতে হচ্ছে।
এ ব্যাপারে স্হানীয়দের অভিযোগ, কিছু রাজনৈতিক নেতা, এক শ্রেণীর অসাধু পুলিশ সদস্য ও প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে চলছে এই রম রমা বাণিজ্য । প্রতিদিন শত শত গাড়ি পার্কিং আর ফুটপাতের দোকানের টাকায় ফুলে ফেঁপে ওঠছে তাদের পকেট। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গুলশান -২ এর এক বাসিন্দা জানান, স্থানীয় বিএনপি নেতারা সড়ক ফুট পাত দখল করে এসব অবৈধ ব্যবসা করার সুযোগ করে দিচ্ছে। আমরা যখন সকালে হাঁটতে বের হই, তখন ফুটপাতে দোকান বসিয়ে চলাচলের রাস্তা দখল করে নেয়। জায়গায় জায়গায় আবার ড্রাইভাররা প্রস্রাব করে রাখে। । ফলে সেখানে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার কোন রাস্তা /পথ অবশিষ্ট থাকেনা।বাধ্য হয়েই আমাদের মূল সড়কে নেমে যেতে হয়। তা ছাড়া ফুটপাতে গাড়ি রাখা থাকে কোনভাবেই চলাফেরা করা যাচ্ছে না। গাড়ি নিয়ে বের হলে ঘন্টার পর ঘন্টা পরে থাকতে হয় যানজটে।
গুলশান সোসাইটি সড়কের বিভিন্ন স্থানে ব্যানার সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়েছে ফুটপাত বা সড়কে ময়লা ফেললে জরিমানা করা হবে। ঠিক সাইন বোর্ডের নিচে ময়লা-আবর্জনা খোলা পায়খানার স্তুপ। এমন পরিস্থিতি প্রায় সকল রাস্তা জুড়েই। কী বিশ্রি পরিস্থিতি!
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোঃ আজাদ এ বিষয়ে বলেন, গুলশানের রাস্তাঘাট ও ফুটপাত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব গুলশান সোসাইটিকে দেওয়া হয়েছে। তারা এ ব্যাপারে ব্যর্থ হলে আমরা নিজেরাই উচ্ছেদ অভিযানে নামব। তিনি আরো স্পষ্ট করে বলেন, ফুটপাতে ব্যবসার জন্য বা সড়কে পার্কিংয়ের জন্য কোন কার্ড সিটি কর্পোরেশন দেয় নি। এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য গুলশান সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক রানা হাবিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
এই অব্যবস্থাপনার বিষয়ে গুলশান থানার ওসি হাফিজুর রহমান এর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, অবৈধ ফুটপাত দখল এবং জনদুর্ভোগের বিষয়ে পুলিশ নিয়মিতভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে। শুধু গুলশান নয়,ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সকল ফুটপাত এখন বিএনপি রাজনৈতিক নেতাদের দখলে।রাস্তায় জনদুর্ভোগ,যানজট আর ভোগান্তির একমাত্র কারণ সকল ফুটপাত দখল করে হাট-বাজার বসানো। সরকার শত শত কোটি টাকা খরচ করে ফ্লাইওভার-এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে নির্মাণ করে ও যানজট নিরসনে কোন সুফল পাচ্ছে না। গত বৃহস্পতিবারও ৫১ নম্বর রোডে অভিযান চালানো হয়েছে অচিরেই ৭৫ নম্বর রোডে অভিযান চলবে। ফুটবার দখল করে দোকান বসানো এবং অবৈধ গাড়ি পার্কিং করে রাখার বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোন ধরনের শৈথিল্য প্রদর্শনের সুযোগ নেই।
তথ্য সূত্র:
*দৈনিক আমার দেশ।
* দৈনিক কালবেলা।
* দৈনিক যুগান্তর।
* বাসস ( বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা)।
*বিডি টুডে নিউজ।
ছবি ক্রেডিট— বিডি টুডে নিউজ।