শিরোনাম :
দুই ভাই এক সংগে এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে। ১১৪ পটুয়াখালী ৪ আসনের নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য  এবিএম মোশাররফ হোসেনকে মন্ত্রিসভার সদস্য করার দাবীতে সংবাদ সম্মেলন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ ও সমকালীন রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে Alliance for Educational Society Development, Bangladesh এর স্বেচ্ছাসেবী ভূমিকা। বাউফলে বিএনপি জামায়াতের দফায় দফায় সংঘর্ষ, আহত প্রায় অর্ধশত। পাসপোর্টের জন্য পঙ্গু বিদেশিনিকে বিয়ে করা কি প্রতারণা? কলাপাড়ার উন্নয়নে ৩৭ দফা প্রস্তাবনা।   পায়রা বন্দরকে আরও আধুনিকায়ন করা হবে…মিট দ্যা প্রেসে কেন্দ্রীয় নেতা  এবিএম মোশাররফ হোসেন। নেত্রকোনা কেন্দুয়ায় ধানের শীষের পক্ষে মাঠে কেন্দ্রীয় নবীন দল। বাউল গানের বরেণ্য শিল্পী কেন্দুয়ার সুনীল কর্মকার চলে গেলেন পরপারে। ট্রেনে প্রতিনিয়ত অনিয়ম দুর্নীতির কারণে সরকার কে বছরে কোটি কোটি টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে—তারিকুল ইসলাম,উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (বাঞ্ছারামপুর)।
সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০২:৫১ অপরাহ্ন

গঙ্গারিডি জাতি কেমন শৌর্যবীর্যের অধিকারী ছিল? মহাবীর আলেকজান্ডার কেন তাদের ভয় পেতেন?

Reporter Name / ২৬৮ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পর্ব-১
–রানা চক্রবর্তী
গ্রিক শাসক আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সমসাময়িক গ্রীক লেখকেরা, যাঁদের মধ্যে অনেকেই তখন এদেশে এসেছিলেন, এবং এর পরবর্তীসময়ে মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের কাছে প্রেরিত গ্রিক রাজদূত মেগাস্থিনিসের ভারত সম্বন্ধে বিবরণ—প্রাচীন ভারতবর্ষ সম্বন্ধে আগ্রহশীল গ্রিক ও ল্যাটিন পণ্ডিতদের লেখনী ধারণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল বলে ইতিহাসে দেখতে পাওয়া যায়। প্রাচীনকালের বিদেশী লেখকদের এই বিবরণগুলি থেকে একথাই মনে হয় যে, তাঁরা তখন ‘গঙ্গারিডই’, অথবা ‘গন্দারিডই’ অথবা ‘গঙ্গারিডি’ বলে যাঁদের বর্ণনা করেছিলেন, তাঁরা সকলেই প্রায় অভিন্ন ছিলেন। কিন্তু অতীতে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ডঃ দীনেশচন্দ্র সরকার অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে, গন্দারিদৈ নিঃসন্দেহে প্রাচীন ভারতের গান্ধার জাতি ছিল। সুতরাং সেযুগের বিদেশী লেখকরা পাঞ্জাববাসী গান্ধারদের সঙ্গে দক্ষিণ বাংলার জাতি বিশেষকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। (‘গঙ্গারিডি ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপকরণ’ গ্রন্থে সংযোজিত প্রবন্ধ) লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ড. সরকার এবিষয়ে তখন যা কিছু বলেছিলেন, সেসব শুধুমাত্র ‘গন্দারিদৈ’ নামের ভ্রান্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, তখন যাঁরা এই নামের উল্লেখ করেছিলেন, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে গঙ্গারিডাই অথবা গন্দারিদৈ বলতে নিম্ন গাঙ্গেয় সমতলভূমি/সাগরকূলের অধিবাসীদেরই নির্দেশ করেছিলেন। কারণ, যে প্রসঙ্গে তাঁরা নিজেদের লেখায় একথার উল্লেখ করেছিলেন, সেখানে গান্ধারদের বিষয়ে কথা বলবার কোন অবকাশ ছিল না বলেই দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া অন্যান্য ঐতিহাসিকেরাও একথা স্বীকার করেন না যে, আলেকজান্ডার পঞ্চনদবাসী গান্ধারদের ভয়েই নিজের সৈন্য নিয়ে বিপাশা নদীর পূর্বদিকে আর অগ্রসর হননি। সুতরাং, প্রাচীনকালের বিদেশী লেখকেরা যে বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলেননি—একথা বলাই বাহুল্য; বাস্তবে আধুনিকযুগের অনেক দেশী লেখকই তাঁদের নিজেদের ভ্রান্ত ধারণাকে মানুষের মনে সঞ্চারিত করাবার উদ্দেশ্যেই অতীতে এহেন গোলমাল করেছিলেন। এবং একইসাথে একথাও সত্যি যে, অতীতের অনেক ভারততত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিক আবার—গঙ্গারিডই জাতি যে দক্ষিণবঙ্গে বাস করত—একথা জানিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা যে নিম্ন গাঙ্গেয় উপত্যকায় বসবাসকারী বাঙালি ছিলেন, একথাও তাঁদের প্রায় সকলেই বলেছিলেন। কিন্তু এক্ষেত্রে এই প্রাচীন জাতিকে দক্ষিণবঙ্গের অধিবাসী বলাতে কিছুটা গোলমালের সৃষ্টি হয়েছিল।
অতীতে নগেন্দ্রনাথ বসু তাঁর ‘বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস’ নামক গ্রন্থের ব্রাহ্মণ খণ্ডে এই মত প্রকাশ করেছিলেন যে, প্রাচীনকালে গঙ্গারিডি নামক রাজ্যটি প্রথমে গঙ্গাতীরের একটি প্রাচীন দুর্ধর্ষ জনগোষ্ঠী এবং তাঁদের নগর গঙ্গাকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছিল, আর পরবর্তীসময়ে এঁদের প্রভাব ক্রমশঃ সমস্ত উপবঙ্গে বিস্তারলাভ করেছিল। কিন্তু মেগাস্থিনিসের বিবরণে গঙ্গা নামক কোন নগরের অস্তিত্বের কথা পাওয়া যায় না। আর নগেন্দ্রনাথ বসুর পূর্বোক্ত বক্তব্যটি আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের প্রায় পাঁচশো বছর পরে ভৌগোলিক টলেমির গঙ্গার মোহনাগুলিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী বা জাতির গঙ্গারিডি বলে বর্ণিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করলেও তখন শুধুমাত্র দক্ষিণবঙ্গের মানুষেরাই যে গঙ্গারিডি বলে বিদেশী লেখকদের কাছে নির্দিষ্ট হয়েছিলেন, এই যুক্তিকে সমর্থন করে না। তাছাড়া প্রাকমৌর্য ও মৌর্যযুগে এবং টলেমি তাঁর ‘Outline of Geography’ নামক গ্রন্থটি লেখবার সময়ে, অর্থাৎ—খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে শুধুমাত্র দক্ষিণবঙ্গই গঙ্গারিডি বলে উল্লিখিত হয়েছিল বলে তর্ক করলে, অন্য যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, সেটা হল যে, বিদেশী লেখকদের বিবরণের এবং টলেমির ভারত সংক্রান্ত মানচিত্র অনুযায়ী বাংলার দক্ষিণে ও পূর্বে সমুদ্রের অবস্থিতি সেই খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে ও এর পাঁচ-ছ’শো বছর পরে কোথায় ছিল, এবং গঙ্গা-ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী বদ্বীপ সেসময় কতদূর গঠিত হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে তখনকার ভূগোল বিষয়ে পরিষ্কারভাবে অবহিত হওয়া আবশ্যক, যা কার্যত অসম্ভব বলেই মনে হয়।
অন্যদিকে ড. নীহাররঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ নামক গ্রন্থের আদিপর্ব অংশে মন্তব্য করেছিলেন যে, গঙ্গারিডিই নামটি আসলে গঙ্গারাষ্ট্র থেকে উদ্ভুত হয়েছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে সমস্যা হল যে, গঙ্গারাষ্ট্র বলে কোন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রাচীন ভারতের ইতিহাস অথবা সাহিত্য ও ধর্মশাস্ত্র থেকে জানা যায় না। তবে অনেকে এই মত পোষণ করেন যে, খৃষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর চৈনিক সূত্র থেকে বাংলা ও গঙ্গার অভিন্নতা সম্বন্ধে ইতিহাসে কিছু সূত্র অবশ্যই পাওয়া যায়। (Historical Geography of Ancient and Early Mediaeval Bengal, Dr. Amitabha Bhattacharjee, P- 39) কিন্তু এথেকে শুধুমাত্র এই অনুমান করাই চলে যে, বাংলার মত গঙ্গা নামেও কোন দেশ অথবা রাষ্ট্র হয়ত সেসময়ে ছিল। এছাড়া অতীতের কোন কোন সূত্রে এই গঙ্গা নামক দেশটিকে কলিঙ্গ ও মগধের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছিল বলেও দেখা যায়, এবং বলা হয়েছিল যে, গঙ্গাভিত্তিক গঙ্গারাজ্য ও বিদেশীদের (টলেমি এবং পেরিপ্লাস গ্রন্থের গ্রন্থকার) কর্তৃক বর্ণিত গঙ্গা আসলে রাজধানী শহর ও বন্দর, যথাক্রমে রাঢ়দেশ এবং সপ্তগ্রাম ছিল। (The Geographical Dictionary of Ancient and Medieval India, N. L. Dey) অর্থাৎ—এক্ষেত্রে, গঙ্গা নদী, গঙ্গা রাষ্ট্র এবং গঙ্গা বা গঙ্গে নগর বন্দর সেযুগের প্রেক্ষাপটে গঙ্গা নামটির গুরুত্ব, তাৎপর্য ও খ্যাতির কথাই ঘোষণা করে বলে দেখা যায়।
অতীতে এপ্রসঙ্গে ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী ‘History of Bengal’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে (Dacca University Publication) জানিয়েছিলেন যে, গঙ্গারিডি বা গঙ্গারাষ্ট্র ভাগীরথীর পূর্বতীরে অবস্থিত ছিল। কিন্তু অন্যান্যদের কাছে তাঁর এই অভিমত কখনোই যুক্তিগ্রাহ্য হয়ে উঠতে পারেনি। এর কারণ হল যে, গঙ্গারিডি বলে বর্ণিত মানবগোষ্ঠীর বাসভূমির সীমারেখা সম্বন্ধে প্রাচীনকালের বিদেশী লেখকদের বিবরণ থেকে যা কিছু জানা যায়, সেসবের সঙ্গে ড.
রায়চৌধুরীর মন্তব্য কোনধরণের সঙ্গতি রক্ষা করে না বলেই দেখা যায়। তবে মেগাস্থিনিস ও তাঁর পরবর্তীসময়ের বিদেশী লেখকদের বিবরণ থেকে এবিষয়ে যা কিছু জানা যায়, টলেমির ভূগোল থেকে যা কিছু বোঝা যায়, এবং ‘পেরিপ্লাস অফ দি এরিথিয়ান সী’ নামক গ্রন্থের নাবিক গ্রন্থকারের বর্ণনা থেকে যা কিছু প্রতিভাত হয়,—এসব থেকে গঙ্গার উপকূলবর্তী অঞ্চলে গঙ্গাকে কেন্দ্র করে গঙ্গা-রাষ্ট্রের অস্তিত্বের কথা অনুমান করতে কোন অসুবিধা হয় না। বস্তুতঃ অনেকেই মনে করেন যে, এই গঙ্গা রাষ্ট্রকেই তখন ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের আর্যরা সংস্কৃত ভাষায় গঙ্গাহৃদ ও প্রাকৃত ভাষায় গঙ্গারিদ বলে অভিহিত করেছিলেন, এবং বিদেশীরা এটিকেই গঙ্গারিডি বলেছিলেন। আর একারণেই অন্যান্য ঐতিহাসিকেরা এবিষয়ে ড. নীহাররঞ্জন রায় (বাঙ্গালীর ইতিহাস) ও ড.রমেশচন্দ্র মজুমদার (The History of Ancient Bengal) কর্তৃক লিপিবদ্ধ অভিমত—গঙ্গারিডি রাজ্য গঙ্গার পূর্বকূলে অবস্থিত ছিল এবং গঙ্গার পশ্চিমতীর থেকে তাম্রলিপ্তসহ সমুদয় রাঢ়বঙ্গ প্রভৃতি গঙ্গার পশ্চিমতীরস্থ বাংলার অংশ প্রাসী রাজ্যের অন্তর্গত ছিল—একথা স্বীকার করেন না। তাঁদের মতে, এই সিদ্ধান্তগুলি অযৌক্তিক এবং অনৈতিহাসিক তো বটেই, একইসাথে প্রাচীন গ্রিক ও ল্যাটিন লেখকদের বিবরণের উপরেও বিশ্বস্তভাবে নির্ভরশীল নয়। কারণ, কোনক্ষেত্রেই ডিওডোরাস, প্লুটার্ক, কার্টিয়াস, সলিনাস, প্লিনী প্রমুখ ইতিহাস লেখকেরা গঙ্গারিডিকে গঙ্গার পূর্ব উপকূলে অবস্থিত বলে বর্ণনা করেন নি।
অন্যদিকে ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’ নামক গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে বিনয় ঘোষ বলেছিলেন যে, গঙ্গারিডি নামটি আসলে সংস্কৃত গঙ্গারাষ্ট্র, গঙ্গারাঢ়া, গঙ্গাহৃদয় নামের গ্রিক বিকৃতি। অন্যান্যদের মতে, বিনয় ঘোষের এই অনুমান যদিও বাস্তব ইতিহাসের কাছাকাছি পৌঁছানোর একটি প্রচেষ্টা ছিল, কিন্তু তবুও প্রাচীন জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্রে এবং প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে অথবা বৈদিক গ্রন্থগুলিতে গঙ্গারাষ্ট্র বলে কোন রাষ্ট্রের উল্লেখ যেমন পাওয়া যায় না, ঠিক তেমনি আবার গঙ্গারাঢ়া অথবা গঙ্গাহৃদয় বলে কোন দেশ অথবা কোন জাতির উল্লেখও দেখা যায় না। তবে এক্ষেত্রে বিনয় ঘোষের উক্তিটি বিশেষ অর্থপূর্ণ ও আলাদা বলেই মনে হয়। আসলে রাঢ় নামের প্রাচীনত্ব একটি গভীর অনুসন্ধানের বিষয়। এছাড়া খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে রাঢ় শব্দটি যে ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল, একথা অনুমান করবার যথেষ্ট কারণও ইতিহাসে পাওয়া যায়। অতীতে এপ্রসঙ্গে ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’ নামক গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে বিনয় ঘোষ বলেছিলেন—
“জৈন আচারাঙ্গ সূত্রে (খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক) লাঢ় দেশের নাম পাওয়া যায়।”
এছাড়া অতীতের অন্যান্য পণ্ডিতদের মধ্যে প্রাচাবিদ্যামহার্ণব নগেন্দ্রনাথ বসুও রাঢ় শব্দটির প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে সুনিশ্চিত ছিলেন বলে দেখা যায়। সুতরাং আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময়ে যে গঙ্গারাঢ় বা গঙ্গারাঢ়ী শব্দটি এদেশের মানুষ বা বিদেশীদের কাছে একেবারেই অজ্ঞাত ছিল, এমন অনমনীয় মনোভাবের বশবর্তী হওয়া কোনভাবেই ইতিহাসের পক্ষে যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে হয় না।
কিন্তু ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত আবার তাঁর ‘বাঙ্গলার ইতিহাস’ নামক গ্রন্থের আর্যযুগ অংশে মন্তব্য করেছিলেন যে, গ্রিক লেখকেরা গঙ্গারাঢ়ী বলে কোন জাতির উল্লেখ করে যান নি; এই শব্দটি আসলে কিছু বাঙালির স্বকপোলকল্পিত শব্দ। তবে ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের এই অভিমতকে অন্যান্যরা চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করেননি বলেই দেখা যায়। এছাড়া এক্ষেত্রে একথা বলাও হয়ত অসঙ্গত হবে না যে, গঙ্গারিডি নামটি আসলে রাঢ়বঙ্গকে ভিত্তি করেই উদ্ভুত হয়েছিল। সুতরাং এই বক্তব্যের বিপরীত কোন ধারণাকে প্রশ্রয় দেওয়া আদৌ যুক্তিযুক্ত এবং ইতিহাস-সম্মত নয় বলেই মনে হয়। এছাড়া একইসাথে একথা অস্বীকার করবারও কোন উপায় নেই যে, সেযুগের রাঢ় বা পশ্চিমবঙ্গ বর্তমান বিহারের পূর্বাংশের অনেকটা নিয়েই গঠিত ছিল। প্রসঙ্গতঃ একথাও স্মরণীয় যে, ১৯১২ সালে বৃটিশ ভারতে বিহার প্রদেশ গঠিত হওয়ার আগে পর্যন্ত সিংভূম, মানভূম, পূর্ণিয়া প্রভৃতি অঞ্চল কিন্তু বাংলারই অন্তর্গত ছিল।
তাছাড়া গঙ্গারিডি বা গঙ্গারিডাই বলতে গ্রিক ও অন্যান্য বিদেশী লেখকরা যে আদতে গঙ্গারাঢ়ী শব্দকেই বোঝাতে চেয়েছিলেন, এই বক্তব্যের সমর্থনে ইতিহাসে অন্য আরেকটি শক্তিশালী যুক্তিও বর্তমান রয়েছে বলে দেখা যায়। মেগাস্থিনিসের ভারত বিবরণের অনুসরণকারী ডিওডোরাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের সময়ে প্রাসাই ও গঙ্গারিডইদের রাজাকে জান্দ্রামেস (Xandrames) বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। অন্যদিকে কুইন্টাস কার্টিয়াসের বিবরণ অনুসারে আলেকজান্ডারের ভারতে আগমনের সমসাময়িক প্রাসিয়াই ও গঙ্গারিডেইদের রাজা ছিলেন অগ্রাম্মেস (Agrammes)। ঐতিহাসিকদের মতে, আসলে এই দুটি নামই, এবং বিশেষভাবে অগ্রাম্মেস শব্দটি ঔগ্রসেন শব্দের বিকৃত রূপ। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, পালি ভাষায় রচিত ‘দীপবংশ’ নামক প্রাচীন সিংহলীয় গ্রন্থে মহাপদ্ম নন্দকে উগ্রসেন বলা হয়েছিল। আর প্রাচীন ভারতীয় পুরাণের বর্ণনা অনুসারে তিনি ছিলেন সর্বক্ষত্রান্তক, অর্থাৎ—তিনি তাঁর সময়কার সব ক্ষত্রিয় বা নরপতিকে পরাজিত ও নিহত করেছিলেন। সুতরাং, প্রাচীন সিংহলীয় কাহিনী অনুযায়ী মহাপদ্ম নন্দের পুত্র ধননন্দকেই যে বিভিন্ন প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থে ঔগ্রসেন্য বলে অভিহিত করা হয়েছিল, এবিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। যেহেতু মেগাস্থিনিস তাঁর বিবরণীতে জানিয়েছিলেন যে, তিনি পাটলিপুত্রে অবস্থান করবার সময়ে স্থানীয় রাজকর্মচারীদের কাছ থেকে এই নামটি শুনেছিলেন, সেহেতু গঙ্গারিডি শব্দটিও মেগাস্থিনিসের শোনা গঙ্গারাঢ়ী শব্দ থেকেই উদ্ভুত হয়েছে বলে মনে করলে, অবাস্তব কোন চিন্তা করা হয় না। হয়ত তৎকালীন পাটলিপুত্র তথা মগধের বাসিন্দাদের কাছে তাঁদের পাশের দেশ ‘রাঢ়’ নামটি অজ্ঞাত ছিল না।
আর গঙ্গারিডিদের সঠিক অবস্থান যে ঠিক কোথায় ছিল—এবিষয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি সঙ্কেত খৃষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া ডিওডোরাস সিকিউলাসের একটি মন্তব্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বলে ঐতিহাসিকেরা মনে করে থাকেন। আর একথা বলাই বাহুল্য যে, তাঁর এই উক্তিটি আসলে আলেকজান্ডার অথবা আলেকজান্ডারের পরবর্তীসময়ের ভারতের কোন উৎপত্তিস্থলের সঙ্গে জড়িত ছিল। তাঁর উক্তিটির ইংরেজি অনুবাদ এরকম—
“Now this river which (at its source) is 30 stadia broad, flows from north to south and empties its water into the ocean forming the eastern boundary of the Gangaridai, a nation which possesses a vast force of largest sized elephants. Owing to this, their country has never been conquered by any foreign king for all other nations dread the overwhelming number and strength of these animals.” (Ancient India as described by Megasthenes and Arrian, J. W. Mccrindle, Revised Second Edition, P- 32; Classical Accounts of India, Dr. R. C. Majumdar, P- 234)
ঐতিহাসিকদের মতে, এখানে যেমন গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের অথবা জাতির একটা অস্পষ্ট ভৌগোলিক সীমা নির্দেশ করা হয়েছে, ঠিক তেমনি আবার তাঁদের সামরিক শক্তির গোপন সূত্রটির কথাও বলা হয়েছে। তাছাড়া ডিওডোরাসের এই একই জবানিতে অন্য একটি বিষয় সম্পর্কেও অবগত হওয়া যায়; যথা—
“Alexander the Macedonian, after conquering all Asia, did not make war upon the Gangaridai, as he did on all others; for when he arrived with all his troops at the river Ganges, and had subdued all the other Indians, he abandoned as hopeless an invasion of the Gangaridai when he learned that they possessed four thousand elephants well trained and equipped for war.” (Ancient India as described by Megasthenes and Arrian, J. W. Mccrindle, Revised Second Edition, P: 32-33; Classical Accounts of India, Dr. R. C. Majumdar, P- 234)
উপরে উল্লিখিত এই উক্তি দুটি থেকে আলেকজান্ডারের গঙ্গানদীর ধারে আসবার কথা বাদ দিলেও, গঙ্গারিডিদের যে স্বল্প ভৌগোলিক রূপরেখা ইতিহাসের পর্দায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, আলোচ্য প্রসঙ্গে সেটাই এখন প্রধান বিবেচনার বিষয়। বিশেষতঃ এপ্রসঙ্গে ডিওডোরাসের সীমা নির্দেশক মন্তব্যটি উপেক্ষা করবার কোন যুক্তিযুক্ত কারণ ইতিহাসে অন্ততঃ পাওয়া যায় না। বস্তুতঃ ঐতিহাসিকদের মতে, ভাগীরথীর পশ্চিম দিকের যে ভূভাগ প্রাচীনকালে তাম্রলিপ্ত, সুহ্ম অথবা রাঢ় বলে অভিহিত হত, সেই অংশ তখন গঙ্গারিডিদের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া প্রাচীনকালে কলিঙ্গ বলে পরিচিত—বর্তমানের উড়িষ্যা রাজ্য এবং দক্ষিণদিকে থাকা গোদাবরী পর্যন্ত ভূভাগও তখন এই রাজ্যের সঙ্গেই সংযুক্ত ছিল। (মেদিনীপুরের ইতিহাস, হিন্দুরাজত্ব—তাম্রলিপ্ত রাজ্য, যোগেশচন্দ্র বসু)
কিন্তু প্রাচীনকালে গঙ্গানদী গঙ্গারিডিদের পূর্বসীমা ছিল—অতীতে ‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক যতীন্দ্রনাথ রায়-সহ প্রমুখ অনেকেই এই উক্তিটির যথার্থতা গ্রহণ করতে অক্ষম হয়ে শেষপর্যন্ত ইতিহাসকে বিকৃতকরণের প্রবণতা দেখিয়েছিলেন বলেই লক্ষ্য করা যায়। এমনকি ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ড. নীহাররঞ্জন রায়, ড.হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী, ড. দীনেশচন্দ্র সরকার-সহ অতীতের প্রমুখ শীর্ষস্থানীয় ইতিহাসবেত্তারাও খুব সম্ভবতঃ এই প্রবণতা থেকে মুক্ত হতে পারেননি। তবে এবিষয়ে ঐতিহাসিক রমাপ্রসাদ চন্দ তাঁর ‘গৌড় রাজমালা’ পুস্তকে যা মন্তব্য করেছিলেন, সেটা এপ্রসঙ্গে অত্যন্ত সুযুক্তিপূর্ণ বলেই মনে হয়। এবিষয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল যে, গঙ্গারিডই রাজ্য তখন শুধু রাঢ়দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাহলে যদি একথা ধরে নিতে হয় যে, প্রাচীনকালে গঙ্গারিডি শুধু রাঢ়দেশে তথা গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তাহলে একথাও স্বীকার করে নিতে হয় যে, গঙ্গারিডি রাজ্য রাঢ় দেশকে বাদ দিয়েও কোন সময়েই ছিল না।
তাছাড়া এক্ষেত্রে একইসাথে এটাও লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, অতীতের এসব ইতিহাসবিদ পণ্ডিতেরা অনেকেই প্রাচীন রাঢ়দেশের সঙ্গে উৎকল বা উড্র দেশের জাতিগত, কৃষ্টিগত, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের উপরে কোনধরণের গুরুত্ব আরোপ করেন নি। আর যদিও এঁদের মধ্যে ড. নীহাররঞ্জন রায় মনে করতেন যে, প্রাচীন তাম্রলিপ্তসহ রাঢ়দেশ তখন প্রাসীর মধ্যেই ছিল, কিন্তু তবুও তাঁর এই অনুমান যে যথার্থ ছিল না—একথা আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে। কারণ, যেহেতু মহাপদ্ম নন্দ কলিঙ্গদেশের একটি অংশের উপরে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন বলে ইতিহাস থেকে জানতে পারা যায় (কলিঙ্গরাজ খারবেলের হাতিগুম্ফা শিলালিপি), সেহেতু তাঁর পক্ষে তখন কলিঙ্গ ও রাঢ়দেশের উপরেও নিজের প্রভুত্ব বিস্তার করাই অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল বলেই মনে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে একথাও মনে রাখতে হবে যে, এই মহাপদ্ম নন্দের পুত্রকেই কিন্তু প্রাচীনকালের বৈদেশিক সাক্ষ্যে গঙ্গারিডিদেরও রাজা বলা হয়েছিল। সুতরাং এহিসেবেও গঙ্গার পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত তাম্রলিপ্ত এবং রাঢ়দেশ তখন গঙ্গারিডিরই অধীন ছিল বলেই মনে হয়।
প্রাচীনকালের বিদেশী লেখকেরা জানিয়েছিলেন যে, গঙ্গানদী তখন গঙ্গারিডির পূর্বসীমা হয়ে সাগরে গিয়ে মিলিত হয়েছিল। আর তাঁদের এই উক্তিকে অমান্য করবার অথবা এই উক্তিকে ভুল বলে প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টাকে এযুগের ইতিহাস-সচেতন কারো পক্ষেই অভিনন্দন জানানো সম্ভব নয় বলেই মনে হয়। কারণ, তাঁদের এই বর্ণনার মধ্যে সীমানা নির্দেশক যে ইঙ্গিত রয়েছে, সেটা গঙ্গারিডিকে শুধুমাত্র সমুদ্রের মোহনায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠী বলে দাবি করাকে সমর্থন করে না, এবং এই জনগোষ্ঠীর শুধু দক্ষিণবঙ্গে তথা পূর্ব ও পশ্চিম সুন্দরবন অঞ্চলে অবস্থিতির কথাও ইতিহাসগতভাবে প্রমাণ করে না। অবশ্য এবিষয়ে এই অঞ্চলের আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলির গুরুত্বও কোনভাবেই উপেক্ষণীয় নয়। তবে একইসাথে এপ্রসঙ্গে একথাও মনে রাখা বাঞ্চনীয় যে, টলেমির যুগ এবং মেগাস্থিনিসের যুগের মধ্যে পাঁচ-ছ’শ বছরের ব্যবধান ছিল, এবং মেগাস্থিনিসের বিবরণের ভিত্তিতে রচিত বিদেশীদের বর্ণনায় গঙ্গা অথবা গঙ্গে বলে কোন গঞ্জ-বন্দর বা রাজধানীর উল্লেখ কিন্তু পাওয়া যায় না।
ঐতিহাসিকদের মতে, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গাভিত্তিক সমন্বিত ভূভাগটি খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে কর্ণসুবর্ণের অধিপতি শশাঙ্কের গৌড়রাজ্য বলে পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। তাঁরা বলেন যে, প্রাচীনকালে জৈন আচারাঙ্গসূত্রে বর্ণিত বজ্জভূমি ও সুম্ভভূমি—যা একত্রিতভাবে রাঢ়বঙ্গকে গঠন করেছিল, তা গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশ ও পূর্বাংশের সঙ্গে যুক্ত হয়েই গৌড়পতি শশাঙ্কের সময়ে তাঁর কর্তৃত্বাধীন হয়েছিল। তাহলে মহারাজ শশাঙ্কের রাজ্যসীমার মধ্যে পুণ্ড্র ও বাংলার গাঙ্গেয় অঞ্চলও তখন নিশ্চিতভাবেই অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুতরাং এসব ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে সপ্তম শতাব্দীর এই সম্পূর্ণ রাজ্যটিকেই মেগাস্থিনিস বর্ণিত গঙ্গারিডির সঙ্গে সমার্থক বলে মনে করলে, অসঙ্গত কিছু মনে করা হয় না।
তবে তা বলে গঙ্গারিডিকে ‘tribe’ বললে বোধহয় সঠিক বর্ণনা করা হয় না, অন্ততঃ ইতিহাসগতভাবে তো নয়ই। কারণ, প্রাচীনকালে কয়েকটি ‘tribe’ বা উপজাতি নিয়েই গঙ্গারিডি মানবগোষ্ঠী গঠিত হয়েছিল, যেগুলিকে এখন জাতি বলে অভিহিত করা হয়। আরো ভালো করে বললে, রাষ্ট্রশাসন-বিদ্যর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে গঙ্গারিডি হয়ত তখনও পূর্ণ জাতিত্ব অর্জন করতে পারেনি, তবে ভবিষ্যৎ বাঙালি জাতির বীজ যে এই গঙ্গারিডির মধ্যেই নিহিত ছিল—এবিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু একইসাথে এটাও মনে রাখতে হবে যে, সেযুগে, অর্থাৎ—মৌর্যযুগের অবসান ঘটবার আগে পর্যন্ত গঙ্গারিডিকে ইতিহাসের দিক থেকে সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন একটি রাষ্ট্র বলা যায় কিনা—একথাও অবশ্য বিবেচ্য। অবশ্য মহাপদ্ম নন্দ যদি গঙ্গারিডি থেকেই উদ্ভুত হয়ে থাকেন, অথবা প্রথমে গঙ্গারিডি দেশ অধিকার করবার পরে মগধ অধিকার করে থাকেন, তাহলে আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময়ে গঙ্গারিডির সার্বভৌমত্ব সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ বিশেষ থাকে না।
অতীতের কেউ কেউ গঙ্গারিডি শব্দটিকে ইন্দো-এরিয়ান বলেছিলেন বলে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু প্রাচীনকালে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আর্যরা এই মানবগোষ্ঠীকে গঙ্গাহৃদ বা গঙ্গারিদ—যেটাই বলে থাকুন না কেন, এক্ষেত্রে এই শব্দগুলি যে আদতে আর্যভাষা বা এর অপভ্রংশ থেকেই উৎপন্ন হয়েছিল, একথা বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না। আর গঙ্গারিডি হল এসব শব্দের বা শব্দ দুটির গ্রিক বিকৃতি। তবে এই গঙ্গারিডি শব্দটির অন্য আরেকটি উৎসও ইতিহাসে পাওয়া যায়। ইতিহাস বলে যে, প্রাচীনকালে পাঞ্জাব অঞ্চলের অধিবাসীরা গঙ্গার উপকূলের জনগোষ্ঠীকে গঙ্গার (গঙ্গাল?) বলে অভিহিত করতেন; আর গ্রিকরা তাঁদের কাছ থেকেই যে গঙ্গার শব্দটি গ্রহণ করেছিলেন, এবিষয়ে ঐতিহাসিকরা নিঃসন্দেহ। (Studies in Indian Linguistics, Dr. S. K. Chatterjee) অন্যদিকে ভাষাতত্ত্ববিদ আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের অভিমত অনুযায়ী, প্রাচীনকালে ‘গঙ্গার’ শব্দের সঙ্গে ‘ইড’ প্রত্যয় যোগ করে একবচনে ‘গঙ্গারিডেস’ এবং বহুবচনে ‘ইডাই’ যোগ করে ‘গঙ্গারিডাই’ শব্দটি গ্রিকরা সর্বপ্রথম ব্যবহার করেছিলেন; আর পরবর্তীসময়ে রোমানদের বানান অনুসারে এই শব্দটি গঙ্গারিডি (Gangaridai) হয়ে গিয়েছিল।
এছাড়া এপ্রসঙ্গে এখানে অন্য একটি বিষয় নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনার অবকাশও রয়েছে। এই প্রবন্ধে একটু আগে উল্লিখিত গ্রিক ডিওডোরাসের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, আলেকজান্ডারের সময়ে গঙ্গারিডিদের অধিকারে চার হাজার সুশিক্ষিত এবং সজ্জিত রণহস্তী ছিল। (Ancient India as described by Megasthenes and Arrian, J. W. Mccrindle, Revised Second Edition, P: 32-33) কিন্তু তাঁর এই বর্ণনা আবার খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে প্লিনী কর্তৃক কথিত গঙ্গারিডি-কালিঙ্গেয়ীদের অধিকারে সাতশো রণহস্তী থাকবার সঙ্গে কালগত রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক পরিবর্তন ছাড়া ইতিহাসের সম্পূর্ণ সঙ্গতি রক্ষা করে না বলেই দেখতে পাওয়া যায়। (Classical Accounts of India: Pliny, Dr. R. C. Majumdar, P- 341) অবশ্য ডিওডোরাস (Diodorus) যেহেতু তাঁর বিবরণে গঙ্গারিডি এবং প্রাসীর মধ্যে গঙ্গারিডির শ্রেষ্ঠত্বের ইঙ্গিতই প্রদান করেছিলেন, সেহেতু এই চার হাজার রণহস্তী আলেকজান্ডারের অভিযানের সময়ে গঙ্গারিডি ও প্রাসীর কাছে যৌথভাবে ছিল বলে অনুমান করা যেতে পারে।
বি.দ্র. লেখক প্রাচীন ইতিহাস বিশ্লেষক ও একজন ইতিহাস বিশারদ।
সংশোধনে: মো: মাহবুবুর রহমান খান,সম্পাদক – প্রকাশক
দৈনিক জনতার দেশ ও জনতার দেশ টিভি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category