জারা ইসলাম :
বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি অত্যন্ত বিস্তৃত এবং জটিল। আপনার দেওয়া তালিকার দেশগুলোতে মার্কিন সৈন্য থাকার পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে: নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং কৌশলগত আধিপত্য বজায় রাখা। নিচে অঞ্চলভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলো:
১. এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল (সবচেয়ে বড় উপস্থিতি)
এই অঞ্চলে মার্কিন সৈন্য মোতায়েনের প্রধান লক্ষ্য হলো উত্তর কোরিয়া এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা করা।
জাপান (৫৪,০০০+ সৈন্য): জাপানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি সৈন্য এবং ঘাঁটি রয়েছে (প্রায় ১২০টি)। ওকিনাওয়ার কাদেনা এয়ার বেস এবং কানাগাওয়ার ইয়োকোসুকা নেভাল বেস (যেখানে একটি বিমানবাহী রণতরী থাকে) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ কোরিয়া (২৪,০০০ – ২৮,০০০ সৈন্য): সিউলের কাছে অবস্থিত ক্যাম্প হামফ্রেস হলো আমেরিকার দেশের বাইরের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি। এটি উত্তর কোরিয়ার যেকোনো আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সদা প্রস্তুত থাকে।
ফিলিপাইন: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনার কারণে এখানে মার্কিন উপস্থিতি এবং ঘাঁটির সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে।
২. ইউরোপ ন্যাটো নিরাপত্তা বলয়)
ইউরোপে মার্কিন সৈন্য মোতায়েন মূলত রাশিয়ার প্রভাব প্রতিহত করতে এবং ন্যাটো মিত্রদের সুরক্ষা দিতে।
জার্মানি (৩৫,০০০+ সৈন্য): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই এখানে বড় উপস্থিতি রয়েছে। রামস্টেইন এয়ার বেস হলো ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের প্রধান লজিস্টিক কেন্দ্র।
ইতালি (১২,০০০+ সৈন্য): ভূমধ্যসাগরে নজরদারি এবং লজিস্টিক সাপোর্টের জন্য ইতালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অতি সম্প্রতি (মার্চ ২০২৬) মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে ইতালি তাদের কিছু ঘাঁটি মার্কিন ব্যবহারের জন্য কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
পোল্যান্ড ও রোমানিয়া: ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই দুই দেশে সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা রাশিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি ন্যাটোর শক্তি প্রদর্শন করে।
৩. মধ্যপ্রাচ্য (কৌশলগত ও জ্বালানি নিরাপত্তা)
এখানকার উপস্থিতি মূলত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযান এবং তেলের সরবরাহ পথ নিশ্চিত করার জন্য।
কাতার (১০,০০০+ সৈন্য): এখানে অবস্থিত আল উদেইদ এয়ার বেস মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বৃহত্তম বিমান ঘাঁটি।
বাহরাইন (৭,০০০+ সৈন্য): এখানে মার্কিন নৌবাহিনীর ৫ম ফ্লিট (5th Fleet)-এর সদর দপ্তর অবস্থিত, যা পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা তদারকি করে।
কুয়েত: এটি মূলত একটি লজিস্টিক হাব হিসেবে কাজ করে এবং আপদকালীন সময়ে দ্রুত সৈন্য মোতায়েনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
৪. আফ্রিকা (সন্ত্রাসবাদ দমন ও পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি)
আফ্রিকায় মার্কিন উপস্থিতি প্রধানত আল-শাবাব বা আইএসের মতো চরমপন্থী গোষ্ঠী দমনে।
জিবুতি (৪,০০০+ সৈন্য): এখানে অবস্থিত ক্যাম্প লেমোনিয়ার লোহিত সাগর এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালীর নিরাপত্তা রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নাইজার ও চাদ (প্রত্যাহার): ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ নাইজার থেকে প্রায় ১,০০০ মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে তারা এখন রাশিয়ার সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়াচ্ছে।
৫. চুক্তির ধরন
দেশভেদে এই উপস্থিতি ভিন্ন ভিন্ন চুক্তির ওপর ভিত্তি করে হয়:
(SOFA): এটি একটি আইনি চুক্তি যা নির্ধারণ করে মার্কিন সৈন্যরা ওই দেশে থাকাকালীন কোন আইন মেনে চলবে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি: যেমন ফিলিপাইনের সাথে EDCA চুক্তি, যা নির্দিষ্ট কিছু ঘাঁটিতে মার্কিন অ্যাক্সেস দেয়।
বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির এই বিশাল নেটওয়ার্কের জন্য প্রতি বছর প্রায় ১৫৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় বলে ধারণা করা হয়।
সম্পাদনায় :
মাহবুবুর রহমান খান।