শিরোনাম :
দুই ভাই এক সংগে এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে। ১১৪ পটুয়াখালী ৪ আসনের নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য  এবিএম মোশাররফ হোসেনকে মন্ত্রিসভার সদস্য করার দাবীতে সংবাদ সম্মেলন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ ও সমকালীন রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে Alliance for Educational Society Development, Bangladesh এর স্বেচ্ছাসেবী ভূমিকা। বাউফলে বিএনপি জামায়াতের দফায় দফায় সংঘর্ষ, আহত প্রায় অর্ধশত। পাসপোর্টের জন্য পঙ্গু বিদেশিনিকে বিয়ে করা কি প্রতারণা? কলাপাড়ার উন্নয়নে ৩৭ দফা প্রস্তাবনা।   পায়রা বন্দরকে আরও আধুনিকায়ন করা হবে…মিট দ্যা প্রেসে কেন্দ্রীয় নেতা  এবিএম মোশাররফ হোসেন। নেত্রকোনা কেন্দুয়ায় ধানের শীষের পক্ষে মাঠে কেন্দ্রীয় নবীন দল। বাউল গানের বরেণ্য শিল্পী কেন্দুয়ার সুনীল কর্মকার চলে গেলেন পরপারে। ট্রেনে প্রতিনিয়ত অনিয়ম দুর্নীতির কারণে সরকার কে বছরে কোটি কোটি টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে—তারিকুল ইসলাম,উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (বাঞ্ছারামপুর)।
সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:০২ অপরাহ্ন

এক যে ছিল নেতা–দেবারতী মুখোপাধ্যায়।

Reporter Name / ৫৭ Time View
Update : সোমবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৬

দেবারতী মুখোপাধ্যায় :

যে হাতে বানাতেন বোমা সেই হাতেই আবার আদর করে বুকে তুলে নিচ্ছেন প্যারালাইজড বাল্যপ্রেমিকাকে। তেষট্টি বছর বয়সে বিবাহ করছেন ষাটোর্ধ প্রৌঢ়াকে। হা হা করে হাসতেন, মাতিয়ে রাখতেন শত বিষাদেও, আবার দপ করে জ্বলে উঠতেন দাবানলের মত। পৃথিবী এমন প্রেমিক আর একটাও পেয়েছে কি…!? 🩷🌻

🇮🇳 স্বাধীনতা_আন্দোলনের_অচেনা_নায়ক 🇮🇳

তিনি অনেকভাবে পরিচিত … কেউ তাঁকে মনে রেখেছেন দুর্ধর্ষ আলিপুর বোমা মামলার বিপ্লবী হিসেবে, কারুর কাছে তিনি প্রেসিডেন্সির চোখধাঁধানো সেই কেমিস্ট্রির ছাত্র, যিনি ভারতবিদ্বেষী প্রোফেসরকে জুতোপেটা করার জন্য কলেজ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন। শুধু পড়াশুনোয় মেধাবী নন, যেমন গাইতে পারেন, তেমন সবাইকে মাতিয়ে রাখতে। নিজের ফাঁসির সাজা শুনে আলিপুর আদালতে যখন উদাত্তকন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে উঠেছিলেন, তখন ইংরেজ জাজের চোখও শুকনো থাকেনি। হা হা করে হেসে উঠে গেয়েছেন, ❝বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান..!❞

কেউ আবার মনে রেখেছেন, কীভাবে আন্দামানের সেলুলার জেলে চরম অত্যাচারে তিনি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন! বছরের পর বছর বন্দি থেকেছেন মাদ্রাজের পাগলাগারদে। কিন্তু যার নামেই ‘উল্লাস’, তাঁকে কাবু করতে পারে, এমন কি কেউ থাকতে পারে?

তিনি উল্লাস! উল্লাসকর দত্ত। কারুর কাছে ডাকাবুকো দেশপ্রেমিক, কারুর কাছে গানকবিতাপ্রেমী, কারুর কাছে কিছুটা হঠকারী প্রাণশক্তিতে ভরপুর এক অদম্য মনোবলের মানুষ..🔴

কিন্তু আমার কাছে? আমার কাছে তিনি সবার ওপরে এক উত্তাল প্রেমিক! যেমন প্রেমিকের স্বপ্ন প্রতিটি মেয়ে লালন করে। বিপিন পালের কন্যা লীলার সঙ্গে বহুবছরের প্রেম। প্রেমিকার জন্য কত কী ই যে করেছেন! শিবপুরের বাড়ি থেকে খেজুর রসের হাঁড়ি মাথায় করে নিয়ে টানা হেঁটে গেছেন লীলাদের সুকিয়া স্ট্রীটের বাড়িতে, টাটকা খেজুর গুড় খেতে মেয়েটা বড় ভালবাসে যে!

ফাঁসির আদেশ সেলুলার জেলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে যখন বদলে গেল, আন্দামানের জাহাজে ওঠার আগে তিনি লীলাকে জিজ্ঞেস করলেন, ❝ অপেক্ষা করবে তো? যাবজ্জীবন থাকতে হবে না, দেখবে আমি ঠিক ছাড়া পাব। আমরা কিন্তু স্বাধীন ভারতবর্ষে বিয়ে করবই!❞

এগ্রিকালচারের উঁচুক্লাসের ছাত্রী লীলা বলেছিলেন, ❝আমি অপেক্ষা করব।❞🌻

দিনের পর দিন কেটেছে। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর। সেলুলার জেলে অমানুষিক অত্যাচারে, ইলেক্ট্রিক শকে, শত লাঞ্ছনা, অর্ধাহার, অনাহারেও নুয়ে যায়নি উল্লাসকরের মেরুদণ্ড। লীলার চিঠি এসেছে। তিনিও চিঠি লিখেছেন। স্বপ্ন দেখেছেন, কোন একদিন লীলা তাঁর হবে। হবেই। লীলাও লন্ডন গেছে। ফিরে এসে একাধিক চাকরি নিয়েছে। বয়স ত্রিশ পেরিয়েছে। সে বিয়ে করেনি।

কিন্তু এখানেও খলনায়ক ব্রিটিশ কূটনীতি। ইন্দুভূষণের জেলের মধ্যেই আত্মহত্যার পর রাতারাতি উল্লাসকরকে মাথা খারাপের দোহাই দিয়ে সকলের অগোচরে পাঠিয়ে দেওয়া হল মাদ্রাজের পাগলাগারদে..💥

কেউ জানল না সেই খবর। না উল্লাসকরের সহবন্দীরা, না বাড়ির লোক। সেলুলার জেলে চিঠি গেলে ফেরত চলে আসে। জেলারকে প্রশ্ন করে চিঠি লিখলে উত্তর আসে না। সবাই ভাবল, উল্লাস বোধহয় আর বেঁচে নেই। শত শত সেলুলার জেলের বিপ্লবীদের মত তাকেও মেরে ফেলা হয়েছে।

রিক্ত, ক্লান্ত লীলা ততদিনে অনাথ, একা। চল্লিশে পৌঁছে বিয়ে করে নিতে বাধ্য হচ্ছে বোম্বাইবাসী নৃপেন বসুকে।

সুস্থ হয়ে কলকাতা ফিরে রাগে জ্বলে উঠছেন উল্লাসকর। লীলার ভাই নিরঞ্জনের কাছ থেকে খবর পেয়ে নিজের কাছে সযত্নে গুছিয়ে রাখা সব চিঠিপত্র নিয়ে সোজা পাড়ি দিচ্ছেন বোম্বাইতে।

নৃপেন লীলার কান্দিভালির বাড়ির সামনে গিয়ে তীব্র হাঁকডাক, ❝ লীলা! লীলা! তুমি বিয়ে করে ফেললে? এই তোমার কথার দাম? কোথায় সেই নৃপেন। বেরিয়ে আয় ব্যাটা। দেখে নেব তোকে!❞

লীলা ভয়ে কাঁপছে, কী বলবে, বুঝতে পারছে না। সে তো জানত, উল্লাস মৃত। তার স্বামী নৃপেনের দিকে আগুনচোখে এগিয়ে যাচ্ছেন উল্লাসকর, ❝ আমার লীলাকে তুমি বিয়ে করেছ? এত বড় স্পর্ধা..?❞🔥

বিধ্বংসী উল্লাসের তেজ কে না জানে, ভয়ে নৃপেন ঝটিতি ঘরে ঢুকে খিল এঁটে দিচ্ছেন।

উল্লাসকর কিছুক্ষণ করুণ চোখে দেখছেন লীলার শাঁখাপলা, সীমন্তরঞ্জিত সিঁদুর, রাগ ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে দুঃখে। হাউহাউ করে কাঁদছেন। তারপর ধীরে ধীরে ঝোলা থেকে সব চিঠি বের করছেন। পলকে দেশলাই জ্বেলে জ্বালিয়ে দিচ্ছেন সেগুলো। বলছেন, ❝এগুলোকে তোমার সামনেই পুড়িয়ে যাব।❞

লীলা ঝরঝর করে কাঁদছেন, শান্ত করার চেষ্টা করছেন, লীলার ভাই নিরঞ্জন বলছে খেয়ে যেতে, কে শোনে কার কথা! সব চিঠি পুড়িয়ে ছাই করে কথা না বাড়িয়ে তক্ষুনি উল্লাসকর বেরিয়ে পড়ছেন বাড়ি থেকে। তারপর বোম্বাই থেকে ট্রেন ধরে সোজা বাংলা। না। যে কলকাতায় ছড়িয়ে আছে ওঁর আর লীলার প্রেমের স্মৃতি, সেখানে থাকবেন না আর। সোজা চলে যাচ্ছেন নিজের দেশের বাড়ি, পূর্ববঙ্গের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কালীকচ্ছ গ্রামে। সেখানে একা একা থাকছেন। অলস জীবন। নৌকো করে ভেসে পড়ছেন নদীতে। কখনো দোকান খুলছেন। কখনো নিজের কারাজীবন নিয়ে লিখছেন বই।

এভাবে কেটে গেল আরো অনেক বছর। কলকাতায় এসে একদিন আবার দেখা নিরঞ্জনের সঙ্গে। এবার নিরঞ্জন সাংঘাতিক কথা বলল।

❝ লীলাদিদির স্বামী মারা গেছেন উল্লাসদা! লীলাদিদির দুটো পা-ই প্যারালাইজড হয়ে গেছে নার্ভের অসুখে। বোম্বাইতে চিকিৎসায় কিছু সুবিধে হয়নি, তাই ডাঃ বিধান রায় এখানে পিজিতে ভর্তি করে দিয়েছেন। দেখার কেউ নেই..।❞

❝ কী বলছিস! লীলা … কলকাতায়?❞

তারপরের অংশ যে কোন চিরায়ত প্রেমকাহিনীকে হার মানাবে..💛🌷

পরেরদিনই উল্লাসকর চলে গেলেন পিজি হাসপাতালে। পাঁজাকোলা করে নিজের বুকে তুলে নিলেন ষাটোর্ধ্ব লীলাকে। লীলা স্তব্ধবাক। কয়েকদিন আসাযাওয়া করে সেবা করলেন। তারপর একদিন ঘোষণা করলেন,

— ❝ আমি লীলাকে বিয়ে করব। করবই..।❞ ❤🌿

বন্ধুবান্ধবের শত আপত্তি, বোঝানোতেও টলানো গেল না তাঁকে। উল্টে রেগে গেলেন। লীলা তো তাঁরই, তিনি ওকে দেখবেন না তো কে দেখবেন?

অবশেষে তেষট্টি বছর বয়সে তিনি বিয়ে করছেন তাঁর চেয়ে বছরখানেকের ছোট লীলাকে। বিয়ের রেজিস্ট্রেশনে লীলার ❝বিধবা❞ পরিচয় দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠছেন। তাঁর লীলা তো এখনো তার চোখে কিশোরী, সে উল্লাসের বউ, অন্যের বিধবা হবে কেন? ওই নৃপেনের সঙ্গে বিয়েকে তিনি বিয়ে বলে মানেনই না। অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে তাঁকে শান্ত করা হচ্ছে।

ততদিনে দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু ঘৃণাভরে তিনি প্রত্যাখ্যান করছেন ❝স্বাধীনতা সংগ্রামীর পেনশন ভাতা❞। নিচ্ছেন না সরকারের থেকে কিছুমাত্র সুবিধা। না রাজনীতির কোন পদ, না কোন কিছু। তাঁর ক্ষমতার লোভ, অর্থের লোভ, খ্যাতির লোভ কিছুই নেই। সবার চোখের আড়ালে চলে গেছেন তিনি।

বলেছেন, ❝ স্বাধীন? এটা স্বাধীন দেশ? যে সরকার দেশভাগ করেছে, মরে গেলেও তাদের থেকে আমি এক পয়সা নেব না..।❞🔴🔥

বিয়ের পর পক্ষাঘাতগ্রস্থ স্ত্রীকে নিয়ে তিনি কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, সংসার পাতছেন আসামের শিলচরে। লীলার কোমরের নীচ থেকে সম্পূর্ণ অবশ, তাকে আদর করে খাওয়ানো, স্নান করানো, সমস্ত কিছু করতেন একা হাতে। প্রতিদিন বিকেলে কোলে করে স্ত্রীকে নিয়ে যেতেন ছাদে। দুজনে বসে সূর্যাস্ত দেখতেন চুপ করে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁর ওভাবেই কেটেছিল। তাঁর মারা যাওয়ার কয়েকবছর আগে মারা গিয়েছিলেন লীলা।

বিলেতফেরত অধ্যাপকের মেধাবী পুত্র, সম্ভ্রান্তবংশীয় বিত্তবান পরিবারের সন্তান হয়েও স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র বিপ্লব তাঁর ও লীলার গোটা জীবনটাকেই ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। কিন্তু তাতে অনুশোচনা ছিল না বিন্দুমাত্র..💛

যতবার পড়ি, খুঁজে বের করি, ততবার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। উল্লাস আনপ্রেডিক্টেবল। উল্লাস একজনই জন্মায়। তিনি যেমন সাহসী বিপ্লবী, তেমনই দামাল পাগল প্রেমিক।

তাঁকে ভুলে যাওয়া আমাদের তীব্র লজ্জা। আমাদের ইতিহাস বইতে স্থান পাননি তিনি, যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দেশের জন্য, তিনি আজ বিস্মৃতপ্রায়! আন্দামানের বিমানবন্দর সাভারকরের নামে, সেখানেও নেই তিনি, এই পোড়া বাংলাতেও তিনি নেই। উল্লাসকরের কথা বলতে হবে। বারবার বলতে হবে। যাতে প্রতিবার একজন করে অন্তত তাঁকে জানতে পারেন।

♦️তথ্যসূত্রঃ দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের ‘কৃষ্ণসিন্ধুকী’ উপন্যাস থেকে সংগৃহিত।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category