শামিম হোসাইন:
হোক খোমেনি স্বৈরাচার, হোক তিনি ফ্যাসিস্ট (তাদের ভাষায়)। এই অভিধান আমার বিবেক কাঁপায় না। কারণ; ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে– যারা সাম্রাজ্যবাদের চোখে ‘স্বৈরাচার’, তারাই নির্যাতিত মানুষের শেষ আশ্রয়। আমার আপত্তি নেই সেই শাসকের প্রতি, যিনি ধর্মীয় অনুশাসনকে রাষ্ট্রীয় মেরুদণ্ড বানান; আমার আপত্তি নেই সেই নেতৃত্বের প্রতি, যে ক্ষমতার নেশায় নয়, আদর্শের দায়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
যিনি ফিলিস্তিনের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে কাঁদেন না, বাঙ্গু ফেসবুকীয় কী-বোর্ড মুজাহিদদের মতো ভেজিটেবল শুটকির রচনা লেখেন না। খোমেনি হাতিয়ার তুলে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
যিনি মুসলমান নির্যাতনের খবর পেলে আগে পরিচয়পত্র খোঁজেন না– কে সুন্নী, কে শিয়া! তিনি প্রশ্ন করেন, “কে জালিম, কে মজলুম?” যে নেতৃত্ব পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে, সমান শক্তিতে যুদ্ধ করে তথাকথিত অজেয় মার্কিন বাহিনীকে কুপোকাত করে দিতে পারে, সে নেতৃত্বকে আমি অবজ্ঞা করতে পারি না।
যিনি ডলারের শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলে স্বর্ণে লেনদেনের কথা বলেন, সুন্নাতী মুদ্রা-ব্যবস্থার দিকে ফিরে তাকান, বৈশ্বিক আর্থিক দাসত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ান– তিনি আমার কাছে শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক নন, তিনি এক রাজনৈতিক প্রতিবাদ।
আমি ইরানে দেশদরদী খোমেনিকে চাই। আমি চাই এমন এক ইরান, যে ওয়াশিংটনের অনুমতি ছাড়া শ্বাস নিতে শেখে। আমি চাই না আমেরিকার দালাল রেজা পাহলভিকে, যে রাজসিংহাসনে বসলে ইরান শুধু একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রেই পরিণত হবে না, পরিণত হবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উপনিবেশে।
পাহলভি মানেই– তেলসম্পদের উপর বিদেশি পাহারা। পাহলভি মানেই– ইসরায়েলের দিকে তাকিয়ে নতজানু কূটনীতি। পাহলভি মানেই– আমেরিকার সামরিক ঘাঁটির ছায়ায় বন্দী সার্বভৌমত্ব।
পাহলভি ফিরে এলে ইরান আর কখনো ইসরায়েলের ওপর চড়াও হবে না, আর কখনো মার্কিন ঘাঁটি চূর্ণ করবে না, আর কখনো ফিলিস্তিনের পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে না, আর কখনো বিশ্ব মুসলমানদের প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নেবে না। সেক্যুলারিজমের মোড়কে তখন বিক্রি হবে দাসত্ব। গণতন্ত্রের নামে চাপিয়ে দেওয়া হবে আনুগত্য। আর ‘স্বাধীনতা’ শব্দটা হয়ে যাবে ওয়াশিংটনের লাইসেন্স।
আমি সেই ইরান চাই না। আমি সেই ইরান চাই, যে একা দাঁড়াতে জানে, একা লড়তে জানে। আমি সেই ইরান চাই, যে সাম্রাজ্যবাদের মুখে থুতু ছুড়ে দিতে পারে। আমি সেই ইরান চাই, যে মজলুমের পাশে দাঁড়ানোকে অপরাধ ভাবে না। হোক সে খোমেনি।
হোক সে অস্বস্তিকর। হোক সে পশ্চিমা অভিধানে ‘স্বৈরাচার’। কিন্তু সে অন্তত দালাল নয়। সে অন্তত মাথা নত করে না। সে অন্তত ইতিহাসের ভুল পাশে দাঁড়ায় না। খোমেনির সবচেয়ে বড় অপরাধ কী? তিনি আমেরিকার কথা শোনেন না। ডলারের কাছে মাথা নত করেন না। ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র নীতি বানান না। এই অপরাধগুলোই তাকে পশ্চিমা মিডিয়ায় ‘ভিলেন’ বানিয়েছে।
দালাল পাহলভি ও ট্রাম্প প্রশাসন নিপাত যাক, সেপাহসালার খোমেনি মসনদে আসীন থাক।
ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত।