মাহবুবুর রহমান খান: অটোমান সাম্রাজ্যের পতন নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই নানা রকম কল্পকাহিনী শোনা যায়। কেউ বলেন ইব্রাহিম পাশার মৃত্যুদণ্ডই ছিল পতনের মূল কারণ, কেউ আবার শাহজাদা মোস্তফার মৃত্যুকে দায়ী করেন। আবার অনেকেই মনে করেন, সুলতান সুলেমানের স্ত্রী হুররাম সুলতানের ষড়যন্ত্র থেকেই পতনের শুরু। এসব গল্প শুনতে রোমাঞ্চকর হলেও, বাস্তবতার সাথে এগুলোর কোনো মিল নেই। পরিসংখ্যান ও ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই ধরনের যুক্তিগুলো একেবারেই ভিত্তিহীন, শিশুসুলভ এবং ইতিহাসকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করার মতো প্রচেষ্টা।
বাস্তবতা হচ্ছে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন: ভেতরের কোনো কারণে নয়, পুরো পশ্চিমা বিশ্বের মহাযড়যন্ত্রের ফল। প্রকৃতপক্ষে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের জন্য হুররাম সুলতানা বা শাহজাদা মোস্তফার মৃত্যু দায়ী নয়। যদি তাদের যুগেই পতনের কারণ তৈরি হতো, তবে সাম্রাজ্য কীভাবে তাদের পরেও আরও চার শতাব্দী ধরে টিকে থাকলো? বাস্তবতা হলো অটোমানদের পতন ঘটিয়েছে আমেরিকা ও পুরো পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত যড়যন্ত্র।
পশ্চিমাদের প্রধান ভয় ছিল- আরব ও আফ্রিকার ক্রমে উন্মোচিত হতে থাকা তেল-গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ গুলো যদি অটোমান সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে আসে, তবে তারাও রাশিয়া বা চীনের মতো আমেরিকা এবং পুরো পশ্চিমা বিশ্বের আরো এক ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবে। ইউরোপ-আমেরিকা একে সহ্য করতে পারেনি। তাই তারা ধীরে ধীরে অটোমানদের প্রতিটি প্রদেশে বিদ্রোহ ও বিভাজন সৃষ্টি করে। এরপর একে একে ভূখণ্ড ছিনিয়ে নিয়ে তাদের দালাল ও পুতুলদের হাতে তুলে দেয়।
যড়যন্ত্রের কৌশল ও বাস্তব রূপ:
1. সৌদি আরব- অটোমানদের আরব নিয়ন্ত্রণ ধ্বংস করে ব্রিটিশরা তাদের দালাল সৌদ পরিবারকে ক্ষমতায় বসায়। সৌদ পরিবার পশ্চিমাদের কথার পুতুলে পরিণত হয়, যাতে ভবিষ্যতেও তেল ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমাদের হাতেই থাকে।
2. মিশর- নেপোলিয়ন থেকে শুরু করে ব্রিটিশরা বারবার মিশরে হস্তক্ষেপ করে অটোমানদের দুর্বল করে তোলে। শেষমেষ ব্রিটিশদের দালাল প্রশাসনের হাতে মিশর চলে যায়।
3. সিরিয়া ও লেবানন- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফরাসিরা এই অঞ্চল দখল করে নেয় এবং অটোমানদের শাসন ভেঙে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে।
4. ইরাক- তেল-সমৃদ্ধ এই ভূখণ্ড অটোমানদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ব্রিটিশরা সরাসরি দখলে রাখে। পরে তাদের পছন্দমতো সরকার বসিয়ে তেল নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে।
5. প্যালেস্টাইন- ব্রিটিশরা এখানে ইহুদিদের বসতি স্থাপন করায়, যাতে ভবিষ্যতে মুসলিম শক্তির পুনর্জাগরণ রোধ করা যায়। এটি ছিল মুসলিম বিশ্বের অন্তরে স্থাপন করা এক ‘পশ্চিমা কাঁটা’।
6. লিবিয়া- উত্তর আফ্রিকার এই অঞ্চল ছিল অটোমানদের অধীনে সমৃদ্ধ তেল, গ্যাস আর ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যপথের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইতালি ও ব্রিটিশরা ষড়যন্ত্র করে বিদ্রোহ উসকে দেয় এবং শেষমেষ অটোমানদের তাড়িয়ে দিয়ে ইউরোপীয় উপনিবেশে পরিণত করে। লক্ষ্য ছিল তেল ও সমুদ্রবন্দর নিয়ন্ত্রণ।
7. আলজেরিয়া- আলজেরিয়া ছিল সমুদ্রবাণিজ্য ও কৃষি সম্পদের জন্য অটোমানদের একটি মূল ঘাঁটি। ফ্রান্স পরিকল্পিতভাবে বিদ্রোহ ছড়িয়ে অটোমান নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেয়। পরে পুরো দেশ ফরাসিদের উপনিবেশে পরিণত হয়। এতে ভূমধ্যসাগরে অটোমান নৌবাহিনীর শক্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
8. ইয়েমেন- ইয়েমেন ছিল লোহিত সাগরের দরজা, যেখানে অটোমানরা বন্দরনগর Aden এবং আশপাশের কৌশলগত স্থানগুলো দখলে রেখেছিল। ব্রিটিশরা বিদ্রোহ উসকে দিয়ে ধীরে ধীরে ইয়েমেনকে অটোমানদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। কারণ এই অঞ্চল দিয়ে সুয়েজ খাল ও ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ করা যেত।
9. তিউনিসিয়া- অটোমানদের উত্তর আফ্রিকার এই অঞ্চল ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকে ইউরোপে সহজেই নৌপথে যাওয়া যেত। ফরাসিরা এখানে তাদের দালালদের সহায়তায় বিদ্রোহ সৃষ্টি করে এবং এক সময় উপনিবেশে পরিণত করে। এর মাধ্যমে আফ্রিকার উত্তর উপকূল পুরোপুরি ইউরোপীয়দের হাতে চলে যায়। এভাবে চলতে চলতে অটোমান সাম্রাজ্যের অর্থাৎ তুরস্কের ভূখণ্ডের ৮৬% ভূমি মানব জাতির মুখোশ দারি শত্রুদের যড়যন্ত্রের বলিদান হয়ে যায়।
অটোমান সাম্রাজ্যের পতন কোনো অভ্যন্তরীণ ‘প্রেম-ষড়যন্ত্র’ বা ‘রাজকীয় ভুল’ এর কারণে হয়নি। আসল কারণ হলো পশ্চিমা শক্তিগুলোর গভীর রাজনৈতিক পরিকল্পনা, যারা ইসলামী শক্তিকে দমিয়ে রেখে তেল-গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিজের হাতে নিতে চেয়েছিল। সৌদি, মিশর, সিরিয়া, ইরাক, প্যালেস্টাইনসহ প্রতিটি অঞ্চলে বিদ্রোহ উসকে দিয়ে তারা একের পর এক অটোমান ভূখণ্ড ছিনিয়ে নিয়েছিল। অতএব, অটোমান সাম্রাজ্যের পতন মূলত ছিল পশ্চিমা বিশ্বের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের একটি “মাস্টারপ্ল্যান” যেখানে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেওয়া হয়।
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত পোস্ট।