ডেক্স রিপোর্ট :
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব দেশের জ্বালানি তেলের সরবরাহে পড়ছে না বলে দাবি করছে সরকার। নিয়মিত সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা হচ্ছে। একমাত্র রাষ্ট্রায়াত্ব পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) লো-ফিডে ধীরগতি চালু রেখে বিকল্প ব্যবস্থায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। গত ১৫ এপ্রিল, বুধবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মোঃ মনির হোসেন চৌধুরী। দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ও সরবরাহ ব্যবস্থা সন্তোষজনক বলেও উল্লেখ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। গত ১৫ দিন ধরে রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল জ্বালালি তেলের জন্য গ্রাহকদের মধ্যে হাহাকার অবস্থা দেখা গেছে। তীব্র গরম উপেক্ষা করে জ্বালানি সরবরাহকারীদের দীর্ঘ লাইনের সারি বলে দিচ্ছে বর্তমান নাজেহাল চিত্রের বাস্তবতা।কোন কোন পাম্প বন্ধ থাকলেও অধিকাংশ পাম্পের সরবরাহ বেড়েছে বলে জানান পাম্প মালিকরা।সরবরাহকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তারা ৪/৫ টি পাম্প ঘুরে জ্বালানি তেল পেয়েছেন।
মজুদকৃত জ্বালানি তেল উদ্ধারে সরকার জোর চেষ্টা চালিয়ে আসছে বলেও জালান জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মোঃ মনির হোসেন । তিনি গণমাধ্যমকে জানান, এ পর্যন্ত ৫ লাখ ৪ হাজার ২৩৬ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে জ্বালানি তেলের দামও বাড়ানো হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন একাধিক মন্ত্রী ও উপদেষ্টা। এ ব্যাপারে মন্ত্রিসভা কমিটি ও গঠন করেছে সরকার। বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মার্চে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ‘ক্রুড ওয়েল’না পৌঁছানোয় সীমিত সক্ষমতায় চালাতে হচ্ছে। এ নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই। কারণ নিয়মিত আমদানির পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি নিশ্চিত করা হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বিঘ্নতা ঘটেছে। এর ফলে মার্চে ২ লাখ টন এবং এপ্রিলে ১ লাখ টন তেল দেশে আনা সম্ভব হয়নি। সৌদি আরব থেকে মার্চের শুরুতে ১ লাখ টন তেলবাহী জাহাজ ‘নরডিক্স পোলাক্স’ রাস্তানুরা বন্দরে অবস্থান করছে।নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জাহাজটি হরমুজ অতিক্রম করতে পারেনি। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসার কথা আরেকটি জাহাজও স্থগিত করা হয়েছে। তবে বিকল্প পথে সরবরাহ নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। তিনি আরো বলেন,১ লাখ টন ‘এরাবিয়ান লাইড ক্রুড ওয়েল’ নিয়ে একটি জাহাজ ২০ এপ্রিল রওনা দিয়ে ২-৩ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারে। এছাড়া মে মাসে আরো ১ লাখ টন ক্রুড ওয়েল সরবরাহের জন্য সৌদি আরবকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।জরুরি চাহিদা মেটাতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আরো ১ লাখ টন ‘ক্রুড ওয়েল’ আমদানির অনুমোদনও দেয়া হয়েছে।যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে বাঁধা সৃষ্টি হলেও পর্যাপ্ত পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে সীমিত পর্যায়ে ইআরএলের উৎপাদন অব্যাহত রেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা হচ্ছে। মজুদ পরিস্থিতির বিষয়ে মনির হোসেন জানান, বর্তমানে দেশে ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৫ টন ডিজেল, ৩১ হাজার ৮২১ টন অকটেন,১৮ হাজার ২১১ টন পেট্রোল, ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন ফার্নেস ওয়েল,এবং ১৮ হাজার ২২৩ টন জেট ফুয়েল রয়েছে।এ মজুদ দিয়ে আগামী দুই মাসের জন্য পর্যাপ্ত বলেও জানান তিনি।
‘ইস্টার্ন রিফাইনারি’ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন বলেন, এখানে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড ওয়েল পরিশোধন করা হয়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে সৌদি আরব, আরব আমিরাত থেকে ‘এরাবিয়ান লাইট’ ক্রুড আনা হয়।কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চ এপ্রিলে নির্ধারিত সিডিউল অনুযায়ী ক্রুডওয়েল আনতে কিছুটা সমস্যা হয়েছে।আগের মজুদ দিয়ে আমরা কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছি।রিফাইনারীর চারটি ইউনিটের মধ্যে দুটি ইউনিট পুরোদমে চালু আছে।ইস্টার্ন রিফাইনারির এ সাময়িক সীমাবদ্ধতা সরবরাহ চেইনে কোন প্রভাব ফেলবে না বলেও জানান তিনি। এ ব্যাপারে তথ্য উপদেষ্টা বলেন,আমেরিকা আবার ইরানের সঙ্গে রিলেটেড জাহাজগুলো ব্লকে দিচ্ছে। সুতরাং এটা যদি কার্যকর হয় এবং লম্বা সময় থাকে পরিস্থিতি আসলেই খারাপের দিকে যাবে। খুব লম্বা সময় ভর্তুকি দিয়ে যাওয়া আসলে কঠিন। তিনি বলেন, এপ্রিলে দাম বৃদ্ধি করব না। যদি এটা কনটিনিউ করে দামের কিছু এডজাস্টমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে।
এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, জ্বালানির মূল্য নিয়ে সরকারের আলোচনা হয়েছে এ বিষয়ে শিগগির সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন :
রাজধানী সহ সারা দেশে বিভিন্ন এলাকার পেট্রোল পাম্প গুলোতে বিগত ১৫ দিন ধরে দীর্ঘ লাইনের সারি চলমান।তন্মধ্যে মোটর সাইকেল ও প্রাইভেট কারের লাইন চোখে পড়ার মত।মোটরসাইকেলের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং করে জীবিকা নির্বাহ করেন এমন ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার। পাম্প গুলোতে উপচে পড়া ভিড়ের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে পাম্প গুলোতে ভিড় বা ভোগান্তির প্রধান কারণ ‘প্যানিক বায়িং’।গত ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে আমরা যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করতাম এখনো তাই করছি। কিন্তু মানুষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ কাজ করছে যে ভবিষ্যতে কি হবে? ‘ট্রাস্ট পাম্পে’ আগে দৈনিক ৫০-৫৪ হাজার লিটার অকটেন লাগতো,গতকাল সেখানে আমরা ৮০ হাজার লিটারের বেশি সরবরাহ করেছি। তবুও লাইন শেষ হচ্ছে না।আমি জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাইছে তেলের কোন ঘাটতি নেই,তাই মজুদের কোন প্রয়োজন নেই। অভিযোগ রয়েছে,সরবরাহ কারীরা চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করে তেল ঘাটতির অজুহাত দেখিয়ে চড়া দামে খোলা বাজারে বিক্রি করছে।
তথ্য সূত্র
# দৈনিক আমার দেশ
# দৈনিক যুগান্তর
# দৈনিক প্রথম আলো
# বিবিসি নিউজ বাংলা
# বিডিনিউজ টুয়েন্টি ফোর ডটকম
ছবি:
# বিবিসি নিউজ বাংলার সৌজন্যে।