নঈম নিজাম:
সিরাজুল আলম খান কি বঙ্গবন্ধুর কোনো সমালোচনা করে বক্তৃতা বা বিবৃতি দিতেন? আমি দেখিনি। তিনি নিজের মতো করে চলতেন। ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আওয়ামী লীগের সঙ্গে পোষায়নি বলে দল ছাড়েন। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন বড় সংগঠক।
পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে সিরাজুল আলম খান এবং শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে চলার সৌভাগ্য হয়েছিল। দু’জন দু’মেরুর বাসিন্দা হলেও একদা ছিলেন একই রাজনীতির ধারক। ষাটের দশকে তাঁরা ছিলেন জনপ্রিয় ও আলোচিত ছাত্রনেতা।
সিরাজুল আলম খানকে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে যান তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। হলের কার্ডরুম থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর—পথচলা শুরু। ১৯৬৩ সালে সিরাজুল আলম খান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হন। শেখ মনি চেয়েছিলেন, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীকে। শাহ মোয়াজ্জেম ছিলেন সিরাজুল আলম খানের পক্ষে। কাউন্সিলর ভোটে বিজয়ী হন সিরাজুল আলম খান।
৭০ সালের ভোটে না গিয়ে স্বাধীনতার যুদ্ধ প্রস্তুত করতে সিরাজুল আলম খান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনিই প্রথম ‘মুজিববাদ’ স্লোগান দিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে জাসদ গঠনের পরও সিরাজুল আলম খানের সঙ্গে তাঁর প্রিয় মুজিব ভাইয়ের সম্পর্ক নষ্ট হয়নি।
১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর নিরাপত্তার স্বার্থে বঙ্গবন্ধু সিরাজুল আলম খানকে ভারত পাঠান। ১৫ আগস্ট তিনি পশ্চিমবঙ্গে চিত্তরঞ্জন সুতারের বাড়িতে ছিলেন। তাঁকে ঘুম থেকে তুলে বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর দেন সুতারের স্ত্রী।
জাসদের ভয়াবহ অনেক তাণ্ডবের সময় ধানমন্ডি ৩২ থেকে বের হতে সিরাজুল আলম খানকে অনেকে দেখেছেন। কুমিল্লার জহিরুল কাইউম বাচ্চু মিয়াও তাঁদের একজন।
সিরাজুল আলম খানের সঙ্গে ঢাকা ও নিউইয়র্কে কাটানো অনেক স্মৃতি রয়েছে। তাঁর মুখে কোনো দিন বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে একটি শব্দও শুনিনি। বরং তিনি ইতিহাস তুলে ধরে সমালোচনা করতেন ১৯৭১ সালের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সাংবাদিকের। বলতেন, তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সঠিকভাবে অবস্থান নেননি।
২০১৯ সালের জুন মাসে আমি আমেরিকায় ছিলাম। একদিন ফোন করলেন বন্ধু ও সহকর্মী, বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর নির্বাহী সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমান। বললেন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ভাইয়ের (ইত্তেফাক) বাসায় এসেছি। দাদার সঙ্গে দেখা হয়েছে। দাদা আপনার খোঁজ নিচ্ছেন।সেই দিন দাদা তাঁর লেখা কিছু বই পীর হাবিবের হাতে তুলে দেন আমাদের দুই জনের জন্য। তিন দিন পর দেশে ফিরে অফিসে ঢুকতেই প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব বিপ্লব বড়ুয়ার ফোন। বিপ্লব বললেন, আপনাকে পাচ্ছি না কেন? বললাম, দেশে ছিলাম না।
বিপ্লব বললেন, পীর ভাইয়ের লেখাগুলো নিয়ে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, কোন লেখা? তিনি বললেন, সিরাজুল আলম খানের বই কোড করে লেখা হয়েছে। জবাবে বললাম, এতে সমস্যা কী? এগুলো তো সিরাজুল আলম খানের লেখা বা তাঁকে নিয়ে অন্যদের লেখা।
বিপ্লব বুঝিয়ে বললেন, আদেশ-নির্দেশের কারণেই তিনি ফোন করেছেন। একদিন পর সেই লেখা নিয়ে আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদের প্রতিক্রিয়া আসে। সেগুলোও আমরা প্রকাশ করেছি। এনিয়ে আরও অনেক কথা থাকছে আমার বইতে।
জন্মদিনে আজ স্মরণ করছি রাজনীতি ও ইতিহাসের আড়ালের মানুষটিকে। শ্রদ্ধা রাজনীতি নিয়ে থাকা রহস্য মানব সিরাজুল আলম খান।
লেখক
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।
#ছবিতে, নঈম নিজাম ও সাহিত্যিক-প্রাবন্ধিক রথীন্দ্র প্রসাদ দত্ত (চানু মামা)।